এসএসকেএম হসপিটালের সঙ্গে হজরত সৈয়দ মিস্ত্রী আলী শাহ চিশতী (রহ.)-এর সম্পর্ক
এসএসকেএম হসপিটাল ও হজরত সৈয়দ মিস্ত্রী আলী শাহ চিশতী (রহ.)-এর মাজার : কলকাতার একটি অনন্য আধ্যাত্মিক স্থান।
এক কিংবদন্তি ও ইতিহাসে আবৃত।অলৌকিক ঘটনা ও হাসপাতালের ইতিহাস
ভিক্টোরিয়া ওয়ার্ডের সংযোগ:
২০০২ সালের ১১ জুলাই টাইমস্ অব ইন্ডিয়ার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট দেবদ্বৈপায়ন চ্যাটার্জী দরগাহটির উৎপত্তির কথা বর্ননা করেন। প্রায় ২৪০ বছর আগে যখন হাসপাতালটি নির্মিত হয়েছিল, তখন গণপূর্ত বিভাগ ছিল।
ঐশ্বরিক সমাধান:
ব্রিটিশ প্রকৌশলীরা ভিক্টোরিয়া ওয়ার্ডের উপরের কোণার অংশটিকে মূল ব্লকের সাথে প্রতিসমভাবে (সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে) সংযুক্ত করতে পারছিলেন না। এই সময় ‘হযরত মিস্ত্রি’ নামে এক সাধারণ রাজমিস্ত্রি এর একটি সমাধান সূত্র বের করেন এবং তিনি দাবি করতেন, সেটি তিনি দৈব দর্শনের মাধ্যমে পেয়েছেন। সেই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন এই বলে যে, এই কাজটি করার জন্য তাঁকে নিজের জীবন দিয়ে মূল্য দিতে হবে।
দুর্ঘটনা ও দাফন:
হাসপাতালের নথি উদ্ধৃত করে চ্যাটার্জি বলেন, যেদিন কাজটি সম্পন্ন হয়েছিল, সেদিনই (১৯শে এপ্রিল) হযরত মিস্ত্রী ছাদ থেকে পড়ে মারা যান। তাঁর কথায়, “তিনি যেখানে পড়ে গিয়েছিলেন, সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়েছিল এবং ধীরে ধীরে সেটি একটি দরগাহে পরিণত হয়,”।
যদিও সরকারি হাসপাতালগুলোতে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে উৎসাহিত করা হয় না, তবুও দরগাহটিকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এর পেছনে ২৪০ বছরের পুরোনো ঐতিহ্য রয়েছে। আমি এতে বিশ্বাস না করলেও, সব ধর্মের মানুষ যেভাবে এখানে এসে প্রার্থনা করেন, তাকে আমি সম্মান করি।
সর্বধর্ম সমন্বয় ও ভক্তদের বিশ্বাস :
আমিনা বেগম, মধুভাই শাহ বা হরকিষেন সিং, যেই হোন না কেন, চরম হতাশা সব ধর্মকে এক করে দেয়। টাইমস্ অব ইন্ডিয়ার ভাষ্যমতে, এসএসকেএম ক্যাম্পাসে বসবাসকারী পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউট ফর মেডিকেল এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ-এর উপদেষ্টা, হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা: মনি ছেত্রীও ধর্মান্তরিত হয়েছেন। সুপারিনটেনডেন্ট দেবদ্বৈপায়ন চ্যাটার্জী আরও বলেন, “বিশ বছর আগে যখন আমার ছেলে জন্ডিস ও লিভার ফেইলিউরে ভুগছিল, তখন আমার পরিবার এই দরগাহে গিয়েছিল,”। “বাবা আমাদের অনেক কঠিন সময় পার করতে সাহায্য করেছেন,” —বলেছেন অভিনেতা-বিধায়ক তাপস পালের স্ত্রী নন্দিনী পাল । প্রতি বৃহস্পতিবার হযরত মিস্ত্রি বাবা উরস কমিটি কর্তৃক আয়োজিত একটি বিশেষ প্রার্থনায় শত শত মানুষ অংশগ্রহণ করেন। ভক্তরা ১৯শে এপ্রিলেও সমবেত হন, যা বাবার মৃত্যুবার্ষিকী।
বিশেষ দিন ও সময়সূচি
১) সাপ্তাহিক প্রার্থনা:
প্রতি বৃহস্পতিবার এখানে 'হজরত মিস্ত্রী বাবা ওরস কমিটি'-র পক্ষ থেকে বিশেষ দোয়ার আয়োজন করা হয়, যেখানে শত শত মানুষের সমাগম ঘটে।
২) বার্ষিক ওরস:
প্রতি বছর ১৯ এপ্রিল বাবার মৃত্যুর দিনটি স্মরণ করে বার্ষিক ওরস মোবারক অত্যন্ত মর্যাদার সাথে উদযাপিত হয়।
৩) দর্শনের সময়:
মাজারটি ভক্তদের জন্য ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে।
মাজারটির ভৌগোলিক অবস্থান নিচে ম্যাপে দেখে নিতে পারেন:
[Rich media excluded from paste]
মাজারটির ভৌগোলিক অবস্থান নিচে ম্যাপে দেখে নিতে পারেন:
[Rich media excluded from paste]
প্রকৃত পরিচয় ও নামকরণের কারণ
পুরো নাম:
হযরত সৈয়দ শাহ মিস্ত্রী আলী শাহ (রহ.)।
‘মিস্ত্রী’ নামের পেছনের গল্প:
এটি তার নামের একটি অংশ, কোনো উপাধি নয়। জনশ্রুতি অনুযায়ী, তিনি পেশায় একজন রাজমিস্ত্রি (সুতি কামলা বা নির্মাণকর্মী) ছিলেন। অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করা এই সাধক নির্মাণকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।
কোলকাতায় আগমন:
তিনি আফগানিস্তান বা উত্তর-পশ্চিম ভারত (বর্তমান পাকিস্তান) থেকে কলকাতায় এসেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। কেউ কেউ বলেন তিনি আফ্রিদি বংশোদ্ভূত ছিলেন। দিল্লি বা লাহোর থেকেও তার কলকাতায় আগমনের কথা প্রচলিত আছে।
মাজার স্থানান্তরের প্রচেষ্টা, ও হাসপাতালের পরবর্তী ইতিহাস
· স্থানান্তরের প্রচেষ্টা:
যখন ১৯০২ সালের আশেপাশে এখানে প্রেসিডেন্সি জেনারেল হাসপাতাল (পরবর্তীতে পিজি হাসপাতাল, এখন এসএসকেএম) তৈরির কাজ শুরু হয়, তখন এই কবরটি জায়গার মাঝখানে পড়ে। ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়াররা কবরটি সরানোর চেষ্টা করেন।
· অলৌকিক কাহিনি:
কথিত আছে, কবরের ওপরের কাঠামো ভাঙতে গেলে খন্তা বেঁকে যায়, চেইন পড়ে যায় এবং চেইন টানা বাষ্পীয় ইঞ্জিনও বিকল হয়ে যায়। তৎকালীন ইঞ্জিনিয়ার (যাঁর নাম ডব্লিউ. বি. বেঞ্জামিন বা জন আব্রাহাম বলে বিভিন্ন উল্লেখ আছে) রাতে স্বপ্নাদেশ পান যে এটি একজন মহান ফকিরের কবর এবং এটি সরানো সম্ভব নয়। এরপর নকশা বদলে কবরকে কেন্দ্র করেই ভবন নির্মিত হয়।
অলৌকিকত্ব ও সর্বধর্মসমন্বয়
- · বাবা মিস্ত্রী আলী শাহের মাজার প্রকৃত অর্থেই এক সর্বধর্মসমন্বয়ের স্থান। হিন্দু, মুসলিম, শিখ নির্বিশেষে সবাই এখানে মানত করেন এবং সুস্থতার প্রার্থনা করেন।
- · হাসপাতালের জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীর স্বজনরা তার মাজারে দোয়া ও মানত করতে আসেন। তাদের বিশ্বাস, এই সাধকের আর্শীবাদে অসম্ভব রোগও সারে। অনেকে মনের ইচ্ছা পূর্ণ হলে মাজারে চাঁদা দেন বা শিরনী বিতরণ করেন।
- · প্রতি বছর মহরম মাসে ও অন্যান্য বিশেষ দিনে এখানে কাওয়ালি ও ওরশ অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে হাজারো মানুষ সমবেত হন।
তবু, বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্র (যেমন পুরনো সংবাদপত্রের আর্কাইভ, কলকাতার সুফি ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণা এবং স্থানীয় ইতিহাসবিদদের লেখা) যা জানায়, তার ভিত্তিতে হযরত সৈয়দ মিস্ত্রী আলী শাহ (রহ.)-এর পূর্ণাঙ্গ বিবরণ নিচে তুলে ধরছি।
১. নাম ও উপাধির বিশ্লেষণ
হযরত সৈয়দ শাহ মিস্ত্রী আলী শাহ (রহ.)
· সৈয়দ: এটি নবীজির বংশের সাথে সম্পর্কিত একটি সম্মানসূচক উপাধি।
· মিস্ত্রী: এটি তাঁর নামের একটি অংশ হয়ে গেছে। এটি কোনো বংশগত উপাধি নয়, বরং তাঁর পেশাগত পরিচয়। তিনি যে নির্মাণশ্রমিক বা রাজমিস্ত্রি ছিলেন, সেটাই ধরা দেয় এই নামে। এটি বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তানের সুফি ঐতিহ্যে "খুদি কামলা" বা ‘শ্রমজীবী সাধক’-এর একটি অনন্য উদাহরণ।
২. জীবনকাল ও আগমন
· সময়কাল: অধিকাংশ সূত্র মতে, তিনি ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম থেকে মধ্যভাগ পর্যন্ত (আনুমানিক ১৮০০-১৮৭০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে) জীবিত ছিলেন।
· আগমন: মৌখিক ইতিহাস অনুযায়ী, তিনি আফগানিস্তান বা পারস্য থেকে বের হয়ে এসেছিলেন। অনেকে তাকে ‘আফ্রিদি পাঠান’ বলেও বর্ণনা করে থাকেন। ভারতে আসার আগে তিনি কিছুকাল দিল্লি বা পাঞ্জাব অঞ্চলে কাটিয়েছিলেন বলে শোনা যায়।
· পেশা: কলকাতায় এসে তিনি সাধারণ নির্মাণশ্রমিকের কাজ নেন। তৎকালীন কলকাতা ছিল ব্রিটিশদের রাজধানী, যেখানে প্রচুর নির্মাণকাজ চলত। তিনি দিনে মজুরি করতেন আর রাতে আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকতেন। এই সরল জীবনযাপন ও আধ্যাত্মিকতার সমন্বয় তাঁকে স্থানীয় বাসিন্দাদের চোখে এক বিশেষ মর্যাদায় বসিয়েছিল।
৩. মাজার ও হাসপাতাল নির্মাণের প্রকৃত ইতিহাস
এটি ইতিহাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ। ১৯০০-এর দশকের শুরুর দিকের সরকারি নথি ও সে সময়ের প্রকৌশলীদের স্মৃতিকথায় এর কিছু আভাস পাওয়া যায়:
· প্রাথমিক অবস্থা:
বর্তমান এসএসকেএম হাসপাতালের জায়গাটি ছিল একটি বড় জঙ্গল ও পুরনো কবরস্থান। হযরত মিস্ত্রী আলী শাহের কবর ছিল এই এলাকার একটি উঁচু ঢিবির মতো। স্থানীয় হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের কাছেই জায়গাটি পবিত্র ছিল।
· নির্মাণের সিদ্ধান্ত:
১৯০২ সালের দিকে প্রেসিডেন্সি জেনারেল হাসপাতালের সম্প্রসারণের নকশা চূড়ান্ত হয়। তৎকালীন পূর্ত বিভাগের এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার মি. জে. এ. টমাস (কিছু সূত্রে জন আব্রাহাম) নির্মাণকাজ তদারক করছিলেন।
· স্থানান্তরের ব্যর্থ চেষ্টা:
কথিত আছে, কবরটি নকশার ঠিক মাঝে পড়ায় তা সরানোর জন্য বারবার চেষ্টা করা হয়। প্রথমে শ্রমিকরা কবরের ইট-পাথর ভাঙতে গেলে তাদের হাতের যন্ত্রপাতি (শাবল, খন্তা) বাঁকা হতে থাকে। এরপর বাষ্পচালিত চেইন যন্ত্র (স্টিম চেইন পুলি) লাগিয়ে কবরের উপরের পাথর সরানোর চেষ্টা করা হয়, কিন্তু চেইন ছিঁড়ে যায়।
· স্বপ্নাদেশ ও নকশা পরিবর্তন:
চূড়ান্ত ব্যর্থতার পর, জনশ্রুতি আছে যে, ইঞ্জিনিয়ার স্বপ্নে একজন আলোকিত বৃদ্ধকে দেখেন, যিনি তাঁকে বলেন, ‘এটি আউলিয়ার কবর। এটি সরিও না।’ ভীত হয়ে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রশাসন নকশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। কবরটিকে ঘিরেই তৈরি হয় কার্ডিওলজি ও অর্থোপেডিক বিভাগের ভবনের একটি অংশ। সেই থেকেই মাজারটি ‘লাল মিয়ার মাজার’ বা ‘মিস্ত্রী আলী শাহের মাজার’ নামে পরিচিতি পায়।
৪. অলৌকিকত্ব ও সর্বধর্মসমন্বয়ের কেন্দ্র
· বিশ্বাসের মেলবন্ধন:
এটি এমন একটি স্থান যেখানে হিন্দুরা সিঁদুর ও মালা দেয়, আবার মুসলিমরা ফাতিহা পাঠ করে। কেউ রোগমুক্তির জন্য "মানত" করে, কেউ বা সন্তানকামনা বা বিবাহের সমস্যা সমাধানে দোয়া চায়।
· রোগমুক্তির গল্প:
হাসপাতালে অবস্থিত হওয়ায় এর গুরুত্ব কয়েকগুণ বেড়ে যায়। জটিল অস্ত্রোপচারের আগে বা নাজুক রোগীর স্বজনরা হতাশ হয়ে এখানে মোমবাতি জ্বালান, প্রার্থনা করেন। বিশ্বাস করা হয়, মাজারে সত্য মনের প্রার্থনা কবুল হয়। অনেক রোগী ও তাদের স্বজন সুস্থতার পর এখানে শিরনী বিতরণ করেন।
৫. বর্তমান রীতি ও ওরশ
· দেখাশোনা:
বর্তমানে একটি স্থানীয় ট্রাস্ট এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সহায়তায় মাজারটির রক্ষণাবেক্ষণ হয়।
· ওরশ:
প্রতি বছর মহরম মাসের পরে (বিশেষ করে রবিউল আউয়াল মাসে) বড় জমায়েত হয়। গিলাফ চড়ানো হয় এবং রাতভর কাওয়ালির আসর বসে। এ সময় শুধু রোগীর স্বজনরা নন, গোটা দক্ষিণ কলকাতার হাজার হাজার মানুষ এখানে সমবেত হন।
----------xx----------
[1] [https://www.justdial.com](https://www.justdial.com/Kolkata/Hazrat-Syed-Mistry-Ali-Shah-Baba-Chisty-R-A-Lala-Lajpat-Rai-Sarani/033PXX33-XX33-180423181542-F2F2_BZDET)
[2] [https://timesofindia.indiatimes.com](https://timesofindia.indiatimes.com/city/kolkata/faith-meets-at-hospital-ground/articleshow/15603651.cms)
[3] [https://www.google.com](https://www.google.com/searchviewer/10?svid=CAwSHRIbCgNwdnESFENnMHZaeTh4TVdSNFkzWmljRzB4GAo)


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন