মে দিবস। May Day। আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস
মে দিবস। May Day। আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস
![]() |
| আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস |
বিশেষ নিবেদন :মে দিবসের ছড়া
ঘামের গাথা
ঘামের স্রোতে কাটছি সাঁতার সকাল থেকে সন্ধ্যা,
যে-স্রোতের গতি মন্দা হলেই সভ্যতা হয় বন্ধ্যা।
সেই স্রোতেতেই হাবুডুবু খাই, তোমার তাতে মানা
তবু, তোমার চেয়ে দামি আমি, মানতে তোমার মানা।
— আলী হোসেন
(পুরো ছড়াটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন)
🗓 পরিচিতি ও নামকরণ
আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস সাধারণভাবে ‘মে দিবস’ নামে পরিচিত। বিশ্বের প্রায় ৮০টিরও বেশি দেশে দিবসটি জাতীয়ভাবে উদযাপিত হয়।📜 ঐতিহাসিক পটভূমি :
শ্রমিক আন্দোলনের প্রাথমিক পর্ব :
বর্তমান শ্রমিক সংগ্রাম থেকে ‘মে দিবসে’র সংগ্রাম ছিল অনেকটাই ভিন্ন। ১৭৬০ থেকে ১৮৩২ সাল ছিল ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লবের মূল পর্যায়। এই শিল্প বিপ্লবের মাধ্যমেই যন্ত্র সভ্যতার সূচনা হয়। সে সময় শ্রমিকরা মনে করত, কল-কারখানাই তাদের দুঃখকষ্টের কারণ। তাই ১৭৬০ সালে লেডউড নামক এক সুতাকল শ্রমিকের নেতৃত্বে ইংল্যান্ডের সুতাকল শ্রমিকরা ‘কলভাঙা আন্দোলন’ শুরু করে। ১৮৩০ সাল পর্যন্ত চলেছিল এই আন্দোলন। কিন্তু এই আন্দোলনে শ্রমিকরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করলে ১৭৫৮ সালের পর তারা বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে ট্রেড ইউনিয়নের মাধ্যমে আন্দোলন শুরু করে এবং নিজেরা ঐক্যবদ্ধ হতে থাকেন। কিন্তু ১৮০০ সাল নাগাদ ইংল্যান্ডের পার্লামেন্ট শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন নিষিদ্ধ করে এবং ১৮৪৭ পর্যন্ত নানা ধরনের আইন করে এই আন্দোলন অকেজো করে রাখার চেষ্টা করা হয়।
শ্রমিক আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্ব :
১৯শ শতাব্দীর শেষভাগে ইউরোপ ও আমেরিকায় শ্রমিকদের ওপর শোষণ চরমে ওঠে। তখনকার রীতি অনুযায়ী, ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো রকম বেতন-বিশ্রামের সুস্পষ্ট নিয়মনীতি ছাড়াই পুরুষ, নারী এবং শিশুদের বাধ্যতামূলকভাবে দিনে ১২ থেকে ১৬ ঘন্টা পর্যন্ত শ্রম দিতে বাধ্য করা হতো।
১) শাসন ও শোষণের শিকার :
আমেরিকার শিকাগো শহর তখন শিল্পায়নের অন্যতম কেন্দ্র। কাজের খোঁজে শিকাগোতে মার্কিন, জার্মান এবং ইউরোপের শ্রমিকেরা আসতে শুরু করেন। মাত্র গড়ে দেড় (১.৫০ ডলার) ডলারের বিনিময়ে তারা দিন-রাত কলুর বলদের মতো শ্রম দিয়ে যেতে বাধ্য হন। এর উপর আবার সপ্তাহে ৬ দিন কাজ করার বিধান। শ্রমিকরা অনেকটা যন্ত্রমানবের মতো কাজ করার যন্ত্র হয়ে উঠে। কষ্ট হলেও তারা মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে পারতেন না। কারণ, শ্রমিকরা তখনও সংঘবদ্ধ হয়ে ওঠেননি।উনিশ শতকের গোড়ার দিকে নানান আন্দোলন ও সংগ্রামের মাধ্যমেই পৃথিবী থেকে দাসপ্রথা বিলুপ্ত হয়। কিন্তু শ্রমিকদের কাজের কোনও নির্দিষ্ট সময় নির্ধারিত ছিল না। ফলে শ্রমিকরা সীমাহীন শাসন ও শোষণের শিকার হন। কল-কারখানায় চাকরি টিকিয়ে রাখতে হলে সপ্তাহে ৬ দিন গড়ে প্রায় ১২-১৬ ঘণ্টা অমানুষিক পরিশ্রম করতে হতো। বিনিময়ে মিলত সামান্য কিছু মজুরি, যা গড়ে ১.৫০ ডলারের মতো। আর নিরাপত্তাহীন পরিবেশে কাজ করতে গিয়ে রোগ-ব্যাধি, আঘাত আর মৃত্যুই ছিল তাদের জীবনের নির্মম প্রাপ্তি।
২) ১৮৮৪, শ্রমিক সংগঠনের জন্ম :
এই দুর্বিষহ জীবন যন্ত্রণার বিরুদ্ধে এক সময় আমেরিকার শিকাগো, নিউ ইয়র্ক, উইসকনসিন এবং বিভিন্ন রাজ্যে গড়ে ওঠে সংঘবদ্ধ আন্দোলন। এই শোষিত মানুষ ঘুরে দাঁড়ালোর সিদ্ধান্ত নেয়। সিদ্ধান্ত হয়, দৈনিক আট ঘণ্টা শ্রমের দাবিতে আন্দোলন শুরু করা হবে। ১৮৮০ সালে আমেরিকায় প্রথম এই দাবি উত্থাপিত হয়। এবং এই দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ১৮৮৪ সালে শ্রমিকরা প্রতিষ্ঠা করেন ‘Federation of Organised Trades and Labor Unions of the United States and Canada’। ১৮৮৬ সালে সংগঠনটির নাম পরিবর্তন করে ‘Federation of Labor’ রাখা হয়। এই বৈঠকে ৮ ঘণ্টা কাজের সময় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়। এরপর আমেরিকার বিভিন্ন লেবার ইউনিয়নের সম্মতিক্রমে ঢালাই শ্রমিক সিলভিসের নেতৃত্বে ১৮৮৬ সালের মে মাসের ১ তারিখে সাধারণ ধর্মঘট ডাকা হয়। দাবি ছিল একটাই, দৈনিক ৮ ঘন্টার বেশি কাজ আর নয়।
৩) শ্রমিক আন্দোলন সূচনা :
ধর্মঘটের বিপক্ষে মালিকপক্ষ আন্দোলনকে মোকাবেলা করতে শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাদের গ্রেফতার করতে শুরু করে। এ ছাড়াও বিভিন্ন শ্রমিকদের উপর নির্যাতন করতে থাকে। মালিকপক্ষের চাপিয়ে দেওয়া ১৪-১৬ ঘণ্টা কাজের বেড়াজাল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে প্রাণপণ লড়াই করে শ্রমিকরা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোসহ বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার ধর্মঘটী শ্রমিক ‘আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিশ্রাম, আট ঘণ্টা নিজের জন্য’—এই দাবিতে রাজপথে নামেন। ১৯৮৬ সালের মে মাসের ১-৩ তারিখ পর্যন্ত এই আন্দোলন চলমান ছিল।
৪) ৪ঠা মে, ১৮৮৬ (হে মার্কেট ম্যাসাকার):
এরপর শিকাগোর বিক্ষোভরত শ্রমিকদের উপর চড়াও হয় পুলিশরা। শিকাগোর ম্যাককরমিক হারভেস্টিং মেশিন কোম্পানির সামনে পুলিশ গুলি চালায় শ্রমিকদের উপর। শত শত শ্রমিক আহত হয়, নিহত হয় দুই জন। এই হতাহতের কারণে শ্রমিকরাও উত্তেজিত হয়ে ওঠে। এর পরের দিন ৪ঠা মে হাজার হাজর শ্রমিক আন্দোলনের পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে শিকাগোর ‘হেমার্কেট স্কয়ারে’ সমাবেত হন।
আগের দিন পুলিশকে লক্ষ্য করে অজ্ঞাত এক ব্যক্তি বোমা ছুঁড়েছিলেন। এর পরপরই পুলিশ এবং আন্দোলনকারীদের মধ্যে শুরু হয় উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় এবং সংঘর্ষ। এই সংঘর্ষে সাতজন পুলিশ এবং চারজন শ্রমিক নিহত হয়। দাবি আদায় করতে আসা শত শত নিরস্ত্র শ্রমিক হতাহত হয়। পৃথিবীর শ্রমিক সংগ্রামের ইতিহাসে রক্তাক্ষরে এটি লেখা হয়ে থাকে ‘হেমার্কেট ম্যাসাকার’ নামে। তবে পুলিশের উপর সেদিন কে বা কারা বোমা নিক্ষেপ করেছিলেন তা আজও অমিমাংসিত।
এই রক্তাক্ত ঘটনার পর মার্কিন সরকার শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়। নৈরাজ্যবাদী হিসেবে ৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে গ্রেফতারের বিষয়টি বেশ সাড়া ফেলে। হেমার্কেট ম্যাসাকারে যুক্ত থাকার অভিযোগে ৮ জনের মধ্যে ৭ জনের মৃত্যুদণ্ড আর ১ জনকে ১৫ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি:
প্রথম স্বীকৃতি : ১৮৮৯
প্রথম দিকে আমেরিকার আইন ও বিচার ব্যবস্থা শ্রমিকদের মূল দাবি ‘৮ ঘন্টার কর্মদিবস’ এই দাবিকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে যায়। এরপর ‘ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর ওয়ার্কার্স এন্ড সোসালিস্টস’ ১৮৮৯ সালে মে মাসের ১ তারিখকে ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস’ বলে ঘোষণা করে। হে মার্কেট ম্যাসাকারকে শ্রমিক আন্দোলনের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ১৮৮৯ সালে প্যারিসে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক কংগ্রেসের বৈঠকে বোমা বিস্ফোরণের দিনটির পরিবর্তে আন্দোলন শুরুর তারিখ ১ মে-কে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস ঘোষণা করা হয়।
আমেরিকার স্বীকৃতি : ১৯১৬
যদিও আমেরিকার সরকার এই ঘটনার কোনো স্বীকৃতি দেয়নি এবং শ্রমিকদের আট ঘণ্টা কাজের দাবিকেও গুরুত্ব দেয়নি। এরপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯১৬ সালে আমেরিকা ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিকে আইনি স্বীকৃতি দেয়। ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লবের (৮ মার্চে ১৯১৭) ফলে রাশিয়ার জার (রাজা) দ্বিতীয় নিকোলাসের পতনের ৪ দিন পর আমেরিকা এক সরকারি ঘোষণার মাধ্যমে ‘দিনে ৮ কর্মঘণ্টা’র দাবিকে স্বীকৃতি দিতে এক প্রকার বাধ্য হয়।
রাশিয়ার স্বীকৃতি :
১৯১৭ সালের পর থেকেই সোভিয়েত ক্ষমতাবলয়ে থাকা দেশগুলোতে মে মাসের ১ তারিখে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস বেশ জাকজমকতার সঙ্গে পালন করা শুরু হয়। সোভিয়েত পতনের পরে রাষ্ট্রীয়ভাবে অনেক দেশেই পালন হয় না এখন আর মে দিবস। তবে এখনো বিশ্বের ৮০টি দেশে এই দিন সরকারি ছুটি হিসেবে চিহ্নিত।
· মজুরি কোড (Code on Wages), 2019: সর্বজনীন ন্যূনতম মজুরি (যদিও সমালোচিত), ওভারটাইমের হার দ্বিগুণ করা এবং পুরুষ-নারী-রূপান্তরকামী সকলের জন্য সমান মজুরি নিশ্চিত করা।
· শিল্প সম্পর্ক কোড (Industrial Relations Code), 2020: ছাঁটাই বা লে-অফের থ্রেশহোল্ড বৃদ্ধি ও ধর্মঘটে ৬০ দিনের নোটিশ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
· সামাজিক সুরক্ষা কোড (Code on Social Security), 2020: গিগ ও প্ল্যাটফর্ম শ্রমিকদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া নিয়োগপত্র বাধ্যতামূলক এবং ৪০+ বয়সীদের বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও গ্র্যাচুইটির মেয়াদ এক বছর করা হয়েছে।
· পেশাগত নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও কার্যপরিবেশ কোড (OSHWC Code), 2020: নিরাপত্তা তদারকির থ্রেশহোল্ড বৃদ্ধি এবং নারীদের রাতের শিফটে কাজের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
🇧🇩🇮🇳 বাংলাদেশ ও ভারতে মে দিবস
বাংলাদেশে স্বাধীনতার (১৯৭১) পর থেকে এবং ভারতে ১৯২৩ সাল থেকে (মাদ্রাজে প্রথম) লাল পতাকা সম্বলিত এ দিবসটি সরকারি ছুটির দিন হিসেবে বিপুল উৎসাহে পালিত হয়। বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়ন, রাজনৈতিক দল ও সংগঠন মিছিল, র্যালি ও সেমিনার আয়োজন করে।🌐 ২০২৬ সালের তাৎপর্য ও প্রতিপাদ্য
২০২৬ সাল আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসের ১৪০তম বার্ষিকী। বর্তমান যুগে শ্রমিক অধিকার মানে শুধু ন্যায্য মজুরি নয়, বরং মানসিক স্বাস্থ্য ও কর্মপরিবেশ সমান গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের থিম বা প্রতিপাদ্য বিষয় হলো— “পরিবর্তনশীল জলবায়ুতে কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণ” (Ensuring Safety and Health at Work in a Changing Climate)। আধুনিক চ্যালেঞ্জ, যেমন শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা, জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার সাথে শ্রমিকদের খাপ খাওয়ানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।মে দিবসের আলোকে নতুন শ্রম আইন ২০২০ :
ভারতের নতুন শ্রম আইনগুলিকে ঐতিহাসিক মে দিবসের অর্জনের আলোকে বিচার করলে এগুলিকে একটি স্পষ্ট প্রত্যাবর্তন বা ‘রোলব্যাক’ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। ২০২০ সালে সংসদে পাস হওয়া চারটি শ্রম কোড ২০২৫ সালের ২১শে নভেম্বর থেকে কার্যকর হয়, যা ২৯টি পুরনো কেন্দ্রীয় শ্রম আইনকে একীভূত করে। এই নতুন কোডগুলি হল:· মজুরি কোড (Code on Wages), 2019: সর্বজনীন ন্যূনতম মজুরি (যদিও সমালোচিত), ওভারটাইমের হার দ্বিগুণ করা এবং পুরুষ-নারী-রূপান্তরকামী সকলের জন্য সমান মজুরি নিশ্চিত করা।
· শিল্প সম্পর্ক কোড (Industrial Relations Code), 2020: ছাঁটাই বা লে-অফের থ্রেশহোল্ড বৃদ্ধি ও ধর্মঘটে ৬০ দিনের নোটিশ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
· সামাজিক সুরক্ষা কোড (Code on Social Security), 2020: গিগ ও প্ল্যাটফর্ম শ্রমিকদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া নিয়োগপত্র বাধ্যতামূলক এবং ৪০+ বয়সীদের বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও গ্র্যাচুইটির মেয়াদ এক বছর করা হয়েছে।
· পেশাগত নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও কার্যপরিবেশ কোড (OSHWC Code), 2020: নিরাপত্তা তদারকির থ্রেশহোল্ড বৃদ্ধি এবং নারীদের রাতের শিফটে কাজের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
মে দিবসের সঙ্গে কতটা সাংঘর্ষিক :
শ্রমিক নেতা ও সমালোচকদের মতে, এই সংস্কার ‘সংহিতা’ (codification) নয়, বরং কৌশলে ‘শ্রমিক সুরক্ষার বিলোপসাধন’ (dismantling of protection)। এই নতুন আইন কীভাবে মে দিবসের অর্জিত অধিকারগুলির সাথে সাংঘর্ষিক, তা নিচে তুলে ধরা হলো:১) ⚖️ অর্জিত অধিকার বনাম নয়া বাস্তবতা :
· দৈনিক ৮ ঘণ্টা কর্মদিবস: কার্যকরভাবে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ বাধ্যতামূলক করার সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা ৮ ঘণ্টার মূল দাবিকে দুর্বল করেছে।· ন্যূনতম মজুরি: জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ধার্য অত্যন্ত কম (দৈনিক ১৭৮ টাকা), যা ‘জীবনধারণের উপযোগী মজুরির’ ধারণাকে ব্যর্থ করেছে।
· ছাঁটাই ও চাকরির নিরাপত্তা: সরকারি অনুমতি ছাড়াই ছাঁটাই ও কারখানা বন্ধের থ্রেশহোল্ড ১০০ থেকে বাড়িয়ে ৩০০ কর্মী করা হয়েছে। স্থায়ী-মেয়াদি চাকুরী (Fixed-Term Employment) আইনি বৈধতা লাভ করায় নিয়োগকর্তারা এখন সহজেই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে পারবেন।
· ট্রেড ইউনিয়ন ও ধর্মঘট: ধর্মঘট ডাকার আগে বাধ্যতামূলক ৬০ দিনের নোটিশ ও বাধ্যতামূলক আলোচনার বিধান। নতুন কোডের অধীনে ৫১% শ্রমিকের সমর্থন না থাকলে কোনো ইউনিয়ন এককভাবে আলোচনার অধিকার পাবে না।
· সামাজিক সুরক্ষা: মজুরির সংজ্ঞা পরিবর্তনের ফলে ভবিষ্যৎ তহবিল (PF) ও গ্র্যাচুইটির মতো সঞ্চয় হ্রাস পেতে পারে। কৃষি, গৃহপরিচারিকা ও আশাকর্মীর মতো বিপুল পরিমাণ কর্মজীবী আইনের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছেন।
২) ✊ প্রতিক্রিয়া ও ২০২৬-এর মে দিবস :
নতুন আইনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও তাৎক্ষণিক প্রভাব স্পষ্ট। ২০২৫ সালের ২৬শে নভেম্বর ১০টি কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন ‘কালা দিবস’ (Black Day) পালন করে প্রতিবাদ জানায়। শ্রমিক সংগঠনগুলি এই আইনকে ‘শ্রমিকদের কষ্টার্জিত অধিকারের ওপর স্বাধীনতার পর সবচেয়ে বড় আঘাত’ বলে আখ্যা দিয়েছে। এই বিক্ষোভের মধ্যেই ২০২৬ সালের মে দিবস পালিত হয়। কেরালার মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন সরাসরি নতুন কোডগুলিকে ‘শ্রমিক-অধিকার খর্ব করার জন্য দায়ী’ বলে মন্তব্য করেন। খোদ আরএসএস-সমর্থিত ভারতীয় মজদুর সংঘও (BMS) কোডগুলির কিছু শ্রমিক-বিরোধী ধারার বিরোধিতা করেছে।💎 সারসংক্ষেপ
ভারতের নতুন শ্রম আইন ‘সরলীকরণ’ ও ‘ব্যবসার সুবিধা’র পক্ষে যুক্তি দিলেও, সমালোচকেরা এগুলিকে ‘শ্রমিক-বিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করছেন যা মে দিবসের মূল চেতনা ও অর্জিত অধিকারের সাথে সাংঘর্ষিক। বিশেষজ্ঞরা এই আইনকে রাষ্ট্রের ভূমিকা ‘শ্রমিকদের সুরক্ষাকর্তা’ থেকে কমিয়ে ‘নিষ্ক্রিয় সুবিধাদাতায়’ পরিণত করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।
💎 সারসংক্ষেপ
মে দিবসের রক্তাক্ত ইতিহাস শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে দুর্বার প্রতিবাদের এক চিরন্তন প্রতীক, যা শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইকে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে। এই দিনের মূল বার্তা চিরন্তন: “দুনিয়ার মেহনতি মানুষেরা এক হও, তোমাদের শিকল ছাড়া হারাবার কিছুই নেই!”এক নজরে মে দিবস
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| দিবস | মহান মে দিবস / আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস |
| মূল লক্ষ্য | ৮ ঘণ্টা কর্ম দিবস ও শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করা |
| ঐতিহাসিক আন্দোলন | ১৮৮৬ সাল, শিকাগো (যুক্তরাষ্ট্র) |
| ভারতে প্রথম পালন | ১ মে, ১৯২৩ (মাদ্রাজ) |
| ২০২৬ সালের থিম | পরিবর্তনশীল জলবায়ুতে কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য |
মহান মে দিবস কুইজ (আপনার জ্ঞান যাচাই করুন)
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর আপনার জানা আছে কি?
১. কত সালে শিকাগোর হে মার্কেটে শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে ধর্মঘট শুরু করেন?
* (ক) ১৮৮০ (খ) ১৮৮৬
* (গ) ১৮৯০ (ঘ) ১৯২৩
২. ভারতে প্রথম কবে মে দিবস পালিত হয়?
* (ক) ১৯০১ (খ) ১৯১০
* (গ) ১৯২৩ (ঘ) ১৯৪৭
৩. ২০২৬ সালের মে দিবসের আন্তর্জাতিক প্রতিপাদ্য (Theme) কী?
* (ক) শ্রমিক ঐক্য জিন্দাবাদ
* (খ) পরিবর্তনশীল জলবায়ুতে কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা
* (গ) ৮ ঘণ্টা কাজের লড়াই
* (ঘ) উন্নত ভারত গঠন
৪. বাংলাদেশে কত সাল থেকে মে দিবসকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ছুটি ঘোষণা করা হয়?
* (ক) ১৯৭১ (খ) ১৯৭২
* (গ) ১৯৭৫ (ঘ) ১৯৮০
------------------------------
## সঠিক উত্তরসমূহ:১. (খ) ১৮৮৬ সাল
২. (গ) ১৯২৩ সাল (মাদ্রাজে)
৩. (খ) পরিবর্তনশীল জলবায়ুতে কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা
৪. (খ) ১৯৭২ সাল (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম এই ঘোষণা দেন)
------------------------------


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন