ভারতের জাতীয় পতাকার প্রকৃত রূপকার
ভারতের জাতীয় পতাকার ইতিহাস : প্রকৃত রূপকার কে?
জাতীয় পতাকার প্রকৃত নক্সাকার কে ছিলেন?
ভারতের বর্তমান জাতীয় পতাকার নকশাটি পিঙ্গালি ভেঙ্কাইয়া (Pingali Venkayya)-র করা বলে বহুল প্রচলিত থাকলেও, প্রকৃত অর্থে বর্তমান পতাকার চূড়ান্ত রূপটি এসেছে সুরাইয়া বদরুদ্দিন তৈয়বজি (Surayya Badr-ud-Din Tyabji)-র হাত ধরে। ইতিহাসবিদদের মতে, পিঙ্গালি ভেঙ্কাইয়া ১৯২১ সালে জাতীয় কংগ্রেসের জন্য একটি পতাকা প্রস্তাব করেছিলেন যাতে ছিল লাল ও সবুজ রং—যা হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতীক। পরে গান্ধীজির পরামর্শে তাতে সাদা রং ও চরকার ছবি যোগ করা হয়।কিন্তু ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার প্রাক্কালে যখন জাতীয় পতাকা চূড়ান্ত করার দায়িত্ব ড. রাজেন্দ্র প্রসাদের নেতৃত্বাধীন একটি কমিটির হাতে পড়ে, তখন কমিটির সদস্য সুরাইয়া তৈয়বজি লক্ষ্য করেন যে, কংগ্রেসের তেরঙ্গা পতাকাটি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রতীক, যা জাতির সর্বাঙ্গীণ প্রতিনিধিত্ব করে না। তিনিই প্রথম এই পতাকায় চরকার পরিবর্তে অশোক চক্র (ধর্মচক্র) ব্যবহারের প্রস্তাব দেন, যা সম্রাট অশোকের সাম্রাজ্যবাদী ও ধর্মনিরপেক্ষ ঐতিহ্যের প্রতীক। তিনিই গেরুয়া, সাদা ও সবুজ রং দিয়ে পতাকাটির পুনর্বিন্যাস করে বর্তমান রূপ দেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় পিঙ্গালি ভেঙ্কাইয়াকে ‘জাতীয় পতাকার জনক’ বলা হলেও, চূড়ান্ত নকশার কৃতিত্ব অবশ্যই সুরাইয়া তৈয়বজির।
পিঙ্গালি ভেঙ্কাইয়া ও সুরাইয়া তৈয়বজীর পতাকার মধ্যে পার্থক্য কোথায়?তাই সংক্ষেপে বলা যায়, প্রাথমিক নক্সা পিঙ্গালি ভেঙ্কাইয়ার, কিন্তু চূড়ান্ত ও বর্তমান রূপটি সুরাইয়া তৈয়বজির অবদান। ২০০৪ সালে সুপ্রিম কোর্টে দায়ের হওয়া একটি মামলার প্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় সরকারও স্বীকার করে যে চূড়ান্ত পতাকার নকশা তৈয়বজি সুরাইয়াই করেছিলেন।
যে পটভূমিতে নক্সা করা হয়েছিল :
১৯৪৭ সালের জুলাই মাস। ভারত স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে। দেশভাগের প্রাক্কালে নানা জায়গায় ঘটে চলা রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা ও সম্প্রদায়িক উত্তেজনার কারণে ভারতজুড়ে অস্থিরতা তখন চরমে। এমন পরিস্থিতিতে একটি সর্বজনগ্রাহ্য জাতীয় পতাকা তৈরির দায়িত্ব ছিল অত্যন্ত স্পর্শকাতর। কংগ্রেসের ব্যবহার করা পতাকায় তখন হিন্দু-মুসলিম-অন্যান্য সম্প্রদায়ের প্রতীক হিসেবে লাল, সাদা ও সবুজ—এই তিন রং ব্যবহার করলেও, গান্ধীজির চরকা ছিল কংগ্রেসের দলীয় প্রতীকের মতো।সুরাইয়া তৈয়বজী, যিনি নিজে একজন বিশিষ্ট মুসলিম পরিবারের সন্তান এবং আইসিএস অফিসার, তিনি উপলব্ধি করেন, স্বাধীন ভারতের পতাকায় এমন একটি প্রতীক থাকা উচিত, যা কোনো ধর্ম বা দলের নয়, বরং ভারতের প্রাচীন, গৌরবময় ও ধর্মনিরপেক্ষ সভ্যতার পরিচায়ক। তিনি এই প্রেক্ষাপটে সম্রাট অশোকের সারনাথ স্তম্ভের ধর্মচক্র-কে বেছে নেন। এই চক্র শুধু বৌদ্ধধর্মের প্রতীক নয়, এটি আইন, ন্যায়, ও অগ্রগতিরও প্রতীক—যা একটি নবজাত স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য যথার্থ। অশোক ছিলেন এমন একজন সম্রাট যিনি যুদ্ধ ত্যাগ করে ধর্ম, অহিংসা ও জনকল্যাণের পথ বেছে নিয়েছিলেন। তাঁর শাসন ছিল উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ ঐক্যবদ্ধ শাসন। তাঁর শাসন পদ্ধতি ছিল সারা পৃথিবীর প্রথম জনকল্যাণমুখী শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তনের দাবিদার। পৃথিবীর ইতিহাসে এ কারণেই তিনি ‘মহামতি অশোক’ নামে পরিচিত। এদিক থেকে বিচার করলে, ‘অশোকচক্র’ ভারতের জাতীয় ঐক্য ও ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শকেই তুলে ধরে।
এই নকশার পেছনে ছিল একটি স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি: পতাকা হবে সর্বধর্মসমন্বয়ের, সর্বভারতীয় ঐতিহ্যের, এবং কোনো বিশেষ সম্প্রদায় বা দলের প্রতি পক্ষপাতহীন।
জাতীয় পতাকার ঐতিহাসিক বিবর্তন
ভারতের জাতীয় পতাকার যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০শ শতকের গোড়ায়। এর বিবর্তনের ধাপগুলো এভাবে ব্যাখ্যা করা যায়—১. প্রথম জাতীয় পতাকা (১৯০৬) :
১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দখলে থাকা ভূখণ্ড ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। অর্থাৎ ভারতবর্ষ সরাসরি ব্রিটিশ সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নাই। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এ বছরই একটি পতাকা প্রবর্তন করে ব্রিটিশ পরিচালিত ভারত সরকার। এটিই সর্বভারতীয় স্তরের প্রথম পতাকা। যদিও তার উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সার্বভৌমত্বকে প্রতিষ্ঠা করা। তবে ভারতীয়দের উদ্যোগে এ ধরনের পতাকার সূচনা করেন ১৮৮৩ সালে লাহোরের অধিবাসী শিরিশ চন্দ্র বসু।
১৯০৪ সালে সিস্টার নিবেদিতা স্বদেশী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তৈরি করেছিলেন একটি জাতীয় পতাকা। লাল রঙের ওপর হলুদ ইনসেটে বজ্র ও সাদা পদ্ম সম্মিলিত একটি চারকোনা আকারের এই পতাকা তৈরি করেন মার্গারেট পতাকা নামে পরিচিত।
মনে রাখার মতো কথা :এই হেমচন্দ্র কানুনগোর তৈরি করা বোমা নিয়েই ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল চাকী অত্যাচারী কিংসফোর্ডকে হত্যা করতে গিয়েছিলেন।
২. ম্যাডাম কামার পতাকা (১৯০৭)
১৯০৭ সালে ২২ জুলাই ম্যাডাম ভিকাজি কামা ও শ্যামজি কৃষ্ণবর্মা জার্মানির স্টুটগার্টে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সমাজতন্ত্রী সম্মেলনে একটি পতাকা উত্তোলন করেন। এটি ছিল তেরঙ্গা—উপরে সবুজ (ইসলাম), মাঝে গেরুয়া বা হলুদ (হিন্দু ধর্ম), নিচে লাল (বিপ্লব/ত্যাগ)। মাঝের হলুদ অংশে দেবনাগরী লিপিতে ‘বন্দে মাতরম’ লেখা ছিল। এই পতাকাই ছিল বিদেশের মাটিতে উত্তোলিত প্রথম ভারতীয় পতাকা।৩. অ্যানি বেসান্ত ও তিলকের হোম রুল পতাকা (১৯১৭)
হোমরুল আন্দোলনের সময় অ্যানি বেসান্ত ও লোকমান্য তিলক একটি পতাকা চালু করেন। এতে ছিল ৫টি লাল ও ৪টি সবুজ আনুভূমিক ডোরা। কেউ কেউ দাবি করেন হিন্দুদের সপ্তর্ষিমণ্ডলের সাতটি নক্ষত্র আঁকা হয়েছিল এই পতাকায়। উপরের বাঁ কোণে ছিল ইউনিয়ন জ্যাক, যা তখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনতাই নির্দেশ করত। এই পতাকা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মধ্যে স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে প্রতিফলিত করত।৪. পিঙ্গালি ভেঙ্কাইয়ার পতাকা (১৯২১)
১৮৯৯ থেকে ১৯০২ সাল পর্যন্ত সংঘটিত দক্ষিণ আফ্রিকার দ্বিতীয় বোয়ার যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় পিঙ্গালী ভেঙ্কাইয়া লক্ষ্য করেন, ব্রিটিশ সৈন্যরা নিজেদের ইউনিয়ন জ্যাক পতাকার নিচে অভিন্ন চেতনায় সঙ্ঘবদ্ধ হচ্ছে। পরাধীন ভারতের বহুধা বিভক্ত সমাজকে একটি সর্বভারতীয় প্রতীকের অধীনে চালিত করার তীব্র প্রয়োজন অনুভব করে তিনি নিজস্ব পতাকার ভাবনায় গবেষণা শুরু করেন।
এই ভাবনা থেকেই ১৯১৬ সালে বর্তমান অন্ধ্রপ্রদেশের মাছলিপত্তানামের ভট্লাপেনামারু গ্রামের পিঙ্গালী ভেঙ্কাইয়া চেষ্টা করে শুরু করেন । সহযোগীতায় ছিলেন ওমর সোভানি এবং এইচ বি বোমানজি। এই সময় তিনি তিরিশটি জাতীয় পতাকার ক্যাটালগ তৈরি করেছিলেন। এই ফ্লাক গুলির বিস্তারিত পাওয়া যায় তাঁর লেখা ‘এ ন্যাশনাল ফ্ল্যাগ ফর ইন্ডিয়া’(A National Flag for India) গ্রন্থে।
৫. ১৯৪৭ সালের চূড়ান্ত পতাকা : সুরাইয়া বদরউদ্দিন তৈয়বজি
১৯৪৭ সালের ২২ জুলাই গণপরিষদে জাতীয় পতাকার চূড়ান্ত রূপ গৃহীত হয়। কংগ্রেসের তেরঙ্গার মাঝের সাদা অংশে থাকা চরকার বদলে অশোক চক্র বসানো হয়। এই প্রস্তাবটি কার্যত সুরাইয়া তৈয়বজিরই ছিল, যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে কমিটির সভাপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ এটি পেশ করেন। ২৪টি দণ্ডবিশিষ্ট নীল রঙের এই চক্রটি ধর্ম, আইন ও অগ্রগতির প্রতীক। গেরুয়া রং ত্যাগ ও সাহসের, সাদা শান্তি ও সত্যের, সবুজ বিশ্বাস ও উর্বরতার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। অনুপাত নির্ধারিত হয় ৩:২।কীভাবে এলো চূড়ান্ত রূপ :
১৯৪৬ সালের ৬ ডিসেম্বর ভারতের গণপরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এবছরই ৯ ডিসেম্বর নয়া দিল্লিতে বসে গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন। এই সময় গণপরিষদের সদস্যরা উপলব্ধি করেন যে আমাদের কোন জাতীয় প্রতীক নেই। অথচ একটি দেশের জাতীয় প্রতীক তার কর্তৃত্ব এবং সাংবিধানিক দর্শনের প্রতিনিধিত্ব করে। তাই ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে বহু প্রতীক্ষিত স্বাধীনতা প্রদর্শন এবং প্রজাতন্ত্র হওয়ার পথে প্রথম পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য ভারতের কাছে জাতীয় ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জহরলাল নেহেরু আমাদের জাতীয় প্রতীকের নকশা তৈরীর দায়িত্ব দিয়েছিলেন বদরুদ্দীন তায়েবজিকে।
তাঁর আহ্বানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত নকশা আসতে থাকে। কিন্তু সেগুলোর অধিকাংশই ছিল ব্রিটিশ প্রতীক দ্বারা প্রভাবিত। যখন এভাবে জাতীয় প্রতীক তৈরির প্রচেষ্টা চলছিল তখন অলিখিতভাবে এটাই এটাই স্থির ছিল যে পিঙ্গালী ভেঙ্কাইয়ার নকশা করা ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের স্বরাজ পতাকাটি জাতীয় পতাকা হবে যার কেন্দ্রে গান্ধীজীর চরকা আঁকা থাকবে।
এই সময়েই বদরুদ্দীন তৈয়বজি এবং সুরাইয়া তৈয়েবজি জাতীয় প্রতীকের জন্য সিংহ এবং অশোক চক্রের নকশা উপস্থিত করেন। সুরাইয়া কন্যা লায়লা তৈয়বজি সম্পর্কে লিখেছেন, “তো, আমার মা এর একটি গ্রাফিক্স সংস্করণ আঁকেন এবং ভাইসরায় লজের ছাপাখানা থেকে এর কিছু প্রিন্ট নিয়ে নেন এবং তা সকলেরই পছন্দ হয়। অবশ্যই সেই থেকে চারটি সিংহ (অশোকের সিংহস্তম্ভ) আমাদের জাতীয় প্রতীক হয়ে আছে।” তিনি আরো বলেন, “তখন আমার মায়ের বয়স ছিল 28 বছর। আমার বাবা এবং তিনি কখনো মনে করেননি যে তারা জাতীয় প্রতীকের ‘নকশা’ করেছেন—কেবল ভারতকে এমন কিছুর কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন যা সবসময়ই তার পরিচয় এর অংশ ছিল।
জাতীয় প্রতীকের নকশা করার পর, খানিকটা অপ্রত্যাশিতভাবেই জাতীয় পতাকার জন্য একটি নতুন নকশা তৈরির দায়িত্ব আবার গিয়ে পড়ে তৈয়বজিদের হাতে। কারণ, এই সময় পিঙ্গালি ভেঙ্কাইয়ার নকশা করা —যা আসলে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের দলীয় পতাকা বলে পরিচিতি— পতাকাটিকে জাতীয় পতাকা হিসেবে গ্রহণ করার মৌখিক সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা শুরু হয়। এই পরিস্থিতিতে জাতীয় পতাকার একটি নতুন নকশার দায়িত্ব পান সুরাইয়া তৈয়বজী। এভাবেই জন্ম হয় বর্তমান ভারতের নতুন জাতীয় পতাকা। সুরাইয়ার কন্যা লায়লা তৈয়বজি বিষয়টিকে এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, “তাঁরা সেই একই অশোক চক্রটি (যা সুরাইয়া জাতীয় প্রতীক হিসাবে এঁকেছিলেন) তিন রঙা পতাকায় স্থাপন করেন। এরপর সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যায়। প্রথমে আমার মা এই চক্রটিকে কালো রং দিয়ে এঁকে ছিলেন, কিন্তু গান্ধীজীর আপত্তিতে সেটি গাঢ় নীল রঙের করা হয়।”
মনে রাখতে হবে, স্বাধীন ভারতের প্রথম জাতীয় পতাকাটি সেলাই করার দায়িত্বও পড়েছিল এই সুরাইয়া তৈয়বজীর উপরেই। সুরাইয়াই এই পতাকাটি তৈরি করে জহরলাল নেহেরুকে প্রদান করেন। সেই রাতেই জহরলাল নেহেরু তাঁর গাড়িতে এই ত্রিবর্ণ পতাকাটি গাড়িতে লাগিয়ে রাইসিনা হিলের উপর দিয়ে তাঁর গন্তব্যে চলে যান। এরপর ১৯৪৭ সালের ২২ শে জুলাই গণপরিষদে পতাকাটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।
ঐতিহাসিক ট্রেভার রয়েল-এর অভিমত :
ইংরেজ ঐতিহাসিক ট্রেভার রয়েল তাঁর ‘দ্য লাস্ট ডেজ অফ দা রাজ’ গ্রন্থে এই চূড়ান্ত রূপের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, “ভারতের ইতিহাসে বিদ্যমান বৈপরীত্যগুলোর মধ্যে একটি হলো তার জাতীয় পতাকাটির নকশা করেছিলেন একজন মুসলিম বধু, সুরাইয়া বদরুদ্দীন তৈয়াবজি। মূলত ত্রিবর্ণের গান্ধীর ব্যবহৃত চরকার প্রতীকটি থাকার কথা ছিল। কিন্তু এটি ছিল একটি দলীয় প্রতীক, যা তৈয়াবজির মতে, বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। অনেক বোঝানোর পর গান্ধীজী অশোক চক্রের প্রতীকটিতে রাজি হন, কারণ সম্রাট অশোক হিন্দু ও মুসলিম উভয়ের কাছেই শ্রদ্ধেয় ছিলেন। সেই রাতে নেহেরুর গাড়িতে যে পতাকাটি উড়েছিল সেটি বিশেষভাবে তৈয়বজির স্ত্রী তৈরি করেছিলেন।”
ঐতিহাসিক ক্যাপ্টেন এল পান্ডু রাঙ্গা রেড্ডির অভিমত :
তবে Trever Royal মনে করেন, এই পতাকার চূড়ান্ত নকশার ধারণাটি দিয়েছিলেন তাঁর স্বামী বদরুদ্দীন তৈয়বজী। কিন্তু হায়দ্রাবাদের ঐতিহাসিক ক্যাপ্টেন এল পান্ডুরাঙ্গা রেড্ডি তাঁর দীর্ঘদিনের গবেষণার পর এই সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, ত্রিবর্ণ পতাকাটির চূড়ান্ত নকশা তাঁর স্বামী নন, তিনি নিজেই করেছিলেন। ভারতের গণপরিষদের মাহফেজখানায় সংরক্ষিত রয়েছে এ সংক্রান্ত গবেষণার ও তার নথিপত্র। সেখানেও পতাকা উপস্থাপন কমিটির সদস্যদের নামের তালিকায় সুরাইয়া তাইবজির নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মনে রাখার মত বিষয় :শুধু জাতীয় পতাকা নয়, জাতীয় প্রতীক তৈরিতেও রয়েছে মহীয়সী নারীর ভূমিকা। কীভাবে? দেখুন এখানে।
উপসংহার
ভারতের জাতীয় পতাকা হল একটি দীর্ঘ সংগ্রামী যাত্রার ফসল। ১৮৮৩ থেকে ১৯৪৭—এই সময়ের মধ্যে ভারতের জাতীয় পতাকা পতাকা যেমন পাল্টেছে, তেমনি বদলেছে ভারতের রাজনৈতিক চেতনাও। পিঙ্গালি ভেঙ্কাইয়ার চরকা ছিল স্বদেশি আন্দোলনের প্রতীক, কিন্তু ১৯৪৭ সালে এসে চরকার জায়গায় অশোক চক্র বসিয়ে পতাকাকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ, প্রাচীন ঐতিহ্য ও আধুনিক রাষ্ট্রীয় আদর্শের প্রতীকে রূপান্তরিত করা হয়। এই রূপান্তরের নেপথ্যে ছিলেন সুরাইয়া তৈয়বজি, যাঁর দূরদৃষ্টি ভারতের পতাকাকে একটি দলীয় প্রতীক থেকে, একটি জাতির আত্মপরিচয়ে উন্নীত করেছিল।ঐতিহাসিক তথ্যসূত্র
· ইংরেজ ঐতিহাসিক ট্রেভার রয়েল তাঁর ‘দ্য লাস্ট ডেজ অফ দা রাজ’ গ্রন্থে এই চূড়ান্ত রূপের বর্ণনা দিয়েছেন।গণপরিষদ বিতর্ক (২২ জুলাই ১৯৪৭): এই দিনে জওহরলাল নেহরু জাতীয় পতাকার প্রস্তাব পেশ করেন। তাঁর ভাষণে তিনি বলেন, “এই পতাকা শুধু কোনো সম্প্রদায়ের নয়, এটি সমগ্র ভারতের।”
· পিঙ্গালি ভেঙ্কাইয়া রচিত ‘A National Flag for India’ (১৯১৬): এই পুস্তিকায় তিনি পতাকার প্রাথমিক ধারণা দেন।
· ভারত সরকারের প্রকাশনা ‘India’s Flag: A Historical Perspective’: এতে সুরাইয়া ত্যাবজির অবদান স্বীকার করা হয়েছে।
· রামচন্দ্র গুহর ‘India After Gandhi’ এবং বিপান চন্দ্রের ‘India’s Struggle for Independence’: জাতীয় পতাকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূত্র।
· সুপ্রিম কোর্টের রায় (২০০৪): পতাকা নকশা নিয়ে এক জনস্বার্থ মামলায় কেন্দ্র সরকার জানায়, চূড়ান্ত পতাকার নকশা সুরাইয়া ত্যাবজি করেছিলেন, যদিও প্রাথমিক ধারণা পিঙ্গালি ভেঙ্কাইয়ার কাছ থেকে নিয়েছিলেন।
· পিঙ্গালি ভেঙ্কাইয়া রচিত ‘A National Flag for India’ (১৯১৬): এই পুস্তিকায় তিনি পতাকার প্রাথমিক ধারণা দেন।
· ভারত সরকারের প্রকাশনা ‘India’s Flag: A Historical Perspective’: এতে সুরাইয়া ত্যাবজির অবদান স্বীকার করা হয়েছে।
· রামচন্দ্র গুহর ‘India After Gandhi’ এবং বিপান চন্দ্রের ‘India’s Struggle for Independence’: জাতীয় পতাকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূত্র।
· সুপ্রিম কোর্টের রায় (২০০৪): পতাকা নকশা নিয়ে এক জনস্বার্থ মামলায় কেন্দ্র সরকার জানায়, চূড়ান্ত পতাকার নকশা সুরাইয়া ত্যাবজি করেছিলেন, যদিও প্রাথমিক ধারণা পিঙ্গালি ভেঙ্কাইয়ার কাছ থেকে নিয়েছিলেন।
----------xx-----------


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন