পৃথিবীর মানচিত্রের পরিবর্তন : কীভাবে এবং কেন?
পৃথিবীর মানচিত্রের পরিবর্তন : কীভাবে এবং কেন করা হয়েছে?
![]() |
জাতিসংঘ ও ইউনেস্কোর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিশ্ব মানচিত্রের ঐতিহাসিক পরিবর্তন, কারণ ও তার প্রভাব। |
মানচিত্র পরিবর্তনের মূল কারণসমূহ:
১) আয়তনের বিকৃতি রোধ:
১৫৬৯ সালে নাবিকদের দিকনির্ণয়ের সুবিধার্থে তৈরি মেরকেটর মানচিত্রে বিষুবরেখা থেকে দূরবর্তী অঞ্চলগুলোকে (যেমন গ্রিনল্যান্ড, ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকা) তাদের প্রকৃত আকারের চেয়ে অনেক বড় দেখায়।
২) প্রকৃত ভৌগোলিক অনুপাত:
আফ্রিকা মহাদেশ প্রকৃতপক্ষে গ্রিনল্যান্ডের চেয়ে প্রায় ১৪ গুণ বড়, কিন্তু প্রচলিত মানচিত্রে দুটোকে প্রায় সমান আকারের মনে হয়।
৩) ভৌগোলিক ন্যায্যতা ও সচেতনতা:
বিশ্বজুড়ে শিক্ষা ও আন্তর্জাতিক নথিপত্রে প্রতিটি দেশ ও মহাদেশের আয়তনের সঠিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতেই জাতিসংঘ সমান-আয়তন মানচিত্র ব্যবহারে উৎসাহিত করে।
মেরকেটর প্রজেকশন ও গ্যাল-পিটার্স প্রজেকশন তুলনা :
মেরকেটর প্রজেকশন দিক ও আকৃতি সঠিক রাখে কিন্তু আয়তন বিকৃত করে, আর গ্যাল-পিটার্স প্রজেকশন সঠিক আয়তন প্রদর্শন করে কিন্তু আকৃতি বিকৃত করে।👉| বৈশিষ্ট্য | মেরকেটর প্রজেকশন (Mercator) | গ্যাল-পিটার্স প্রজেকশন (Gall-Peters) |
|---|---|---|
| প্রজেকশনের ধরণ | কনফরমাল (Conformal - আকৃতি ও কোণ ঠিক রাখে) | ইকুয়াল-এরিয়া (Equal-Area - প্রকৃত ক্ষেত্রফল ঠিক রাখে) |
| আকৃতি (Shape) | বিষুবরেখা থেকে দূরবর্তী অঞ্চল (যেমন গ্রিনল্যান্ড) বহু গুণ বড় দেখায়। | ট্রপিক্যাল অঞ্চলের ভূখণ্ড লম্বাটে ও বিকৃত দেখায়। |
| আয়তন (Area) | বিষুবরেখা থেকে দূরবর্তী অঞ্চল (যেমন গ্রিনল্যান্ড) বহু গুণ বড় দেখায়। | প্রতিটি দেশ ও মহাদেশের প্রকৃত আয়তনের অনুপাত সঠিক থাকে। |
| প্রধান ব্যবহার | সামুদ্রিক ও আকাশপথের দিকনির্ণয় (Navigation)। | ভৌগোলিক ন্যায্যতা, শিক্ষা ও আন্তর্জাতিক সচেতনতা। |
| তৈরি ও উদ্ভব | ১৫৬৯ সালে জেরার্ডাস মেরকেটর দ্বারা তৈরি। | ১৮৫৫ সালে জেমস গ্যাল ও ১৯৭৩ সালে আর্নো পিটার্স দ্বারা প্রচারিত। |
সংক্ষেপে, দিক ও নেভিগেশনের জন্য মেরকেটর এবং বিশ্বের সঠিক ভূখণ্ডের অনুপাত বুঝতে গ্যাল-পিটার্স ব্যবহার করা হয়।
সুপারিশকারীদের পরিচয়
কারা করেছিলেন:
পশ্চিম আফ্রিকার দেশ টোগো (Togo) আফ্রিকান ইউনিয়নের (AU) ৫০টিরও বেশি দেশের পক্ষ থেকে জাতিসংঘে এই প্রস্তাব পেশ করে।
পরিবর্তনের পক্ষে যুক্তি :
১৫৬৯ সালে ফ্লেমিশ মানচিত্রবিদ জেরার্ডাস মার্কেটরের তৈরি করা মানচিত্র এতদিন বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এতে সমুদ্রপথের দিকনির্ণয় সহজ হলেও নিরক্ষরেখা থেকে দূরের অঞ্চলগুলোকে অনেক বড় এবং নিরক্ষরেখার কাছের মহাদেশগুলোকে (বিশেষ করে আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকা) তাদের মূল আকারের চেয়ে অনেক ছোট দেখানো হতো। উদাহরণস্বরূপ, মার্কেটর ম্যাপে আফ্রিকা ও গ্রিনল্যান্ডকে দেখতে প্রায় সমান মনে হলেও আফ্রিকা বাস্তবে গ্রিনল্যান্ডের চেয়ে ১৪ গুণ বড়। আফ্রিকার দেশগুলোর মতে, এটি একটি ‘কার্টোগ্রাফিক উপনিবেশবাদ’, যা আফ্রিকা ও গ্লোবাল সাউথের ভূরাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বকে মানসিকভাবে খাটো করে আসছিল।
বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা: সাধারণ পরিষদের সভায় ভোটাভুটিতে ১৬৪টি দেশ প্রস্তাবটির পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় এটি আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়।
প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার কারণ :
বৈজ্ঞানিক সত্যতা ও ভৌগোলিক ন্যায্যতা: বিজ্ঞানভিত্তিক নিরপেক্ষ বিশ্বমানচিত্রের মাধ্যমে প্রতিটি দেশের প্রকৃত ভৌগোলিক আয়তন সঠিকভাবে তুলে ধরা এবং শিক্ষাব্যবস্থায় সঠিক তথ্য দেওয়ার উদ্দেশ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এতে সম্মতি দেয়।বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা: সাধারণ পরিষদের সভায় ভোটাভুটিতে ১৬৪টি দেশ প্রস্তাবটির পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় এটি আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়।
বিরোধিতা করেছিল?
জাতিসংঘের এই ভোটে যুক্তরাষ্ট্রই ছিল একমাত্র দেশ যা প্রস্তাবটির বিপক্ষে ভোট দেয়।মার্কিন যুক্তি: মার্কিন প্রতিনিধিদলের মতে, ১৬ শতকের একটি ঐতিহাসিক নেভিগেশনাল মানচিত্র নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক না করে জাতিসংঘের উচিত বর্তমান বিশ্বের অন্যান্য বাস্তবিক ও জরুরি সংকটগুলোর দিকে নজর দেওয়া। এছাড়া বিশ্বব্যাপী প্রচলিত পাঠ্যপুস্তক, ডিজিটালি জিপিএস এবং প্রশাসনিক মানচিত্র রাতারাতি পরিবর্তন করা বিশাল আর্থিক ও লজিস্টিক ব্যয়ের বিষয়। প্রযুক্তিগত দিক থেকেও সামুদ্রিক ও বিমান চলাচলের জন্য মার্কেটর প্রজেকশন এখনও বেশি উপযোগী।
কারা পক্ষে ছিল এবং কারা বিরত ছিল?
কারা পক্ষে :
পক্ষে: আফ্রিকান ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রসমূহ, ফ্রান্সসহ এশিয়া, ইউরোপ ও ল্যাটিন আমেরিকার ১৬৪টি দেশ প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দেয়।কারা বিপক্ষে :
ভোটদানে বিরত (Abstained): মোট ৬টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে। এদের মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য দেশ হলো ইউক্রেন। নতুন ইকুয়াল আর্থ মানচিত্রে রাশিয়ার দখলে থাকা ‘ক্রিমিয়া’ অঞ্চলকে মূল ইউক্রেন থেকে আলাদা ও ভিন্ন রঙে দেখানোর প্রতিবাদে ইউক্রেন এতে ভোট দেওয়া থেকে বিরত ছিল।উল্লেখ্য, ভারত ও জাপান নতুন এই প্রজেকশনের পক্ষে ভোট দিলেও মানচিত্রে ভারত-চীন সীমানা/কাশ্মীর এবং রাশিয়ার সাথে বিরোধপূর্ণ কুরিল দ্বীপপুঞ্জের সীমান্ত উপস্থাপনা নিয়ে তাদের কূটনৈতিক পর্যবেক্ষণ ও সংশোধনের দাবি জানিয়েছে।
-------××-------


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন