মহুয়া রায় চৌধুরীর প্রয়াণ দিবস
মহুয়া রায় চৌধুরীর প্রয়াণ দিবস :
Death anniversary of Mahua Roy Chowdhury
১৯৮৫ সালের ২২ জুলাই। বাংলা চলচ্চিত্র জগতের উল্লেখযোগ্য অভিনেত্রী মহুয়া রায়চৌধুরী দুর্ঘটনা জনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ২৬ বছর। তাঁর প্রকৃত নাম শিপ্রা রায়চৌধুরী। তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল তাঁর ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’, ‘দাদার কীর্তি’, ‘আদমি অওর আওরাত’ ইত্যাদি।
১৯৮৫ সালের ২২ জুলাই এক বর্ষামুখর রাতে তাঁর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়, এবং প্রায় চার দশক পরেও সেই ঘটনার পেছনের সত্য উন্মোচিত হয়নি ।
তারার উত্থান :
মহুয়া রায়চৌধুরী জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর। কিশোরী বয়সে তিনি একজন নৃত্যশিল্পী হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন, যা তাঁকে চলচ্চিত্রের দুনিয়ায় নিয়ে আসে । তাঁর অভিনয় জীবনের ব্যাপ্তি ছিল মাত্র তেরো বছর। কিন্তু এই সংক্ষিপ্ত সময়েই তিনি তাঁর অসামান্য প্রতিভা এবং অভিনয় দক্ষতার মাধ্যমে দর্শকদের মন জয় করে নেন। ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’, ‘দাদার কীর্তি’, ‘আদমি অর আওরাত’, এবং ‘শত্রু’ -এর মতো কালজয়ী চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় তাঁকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছিল। ১৯৮৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘লাল গোলাপ’ এবং তাঁর আগের বছর ‘শত্রু’ বাণিজ্যিক সাফল্য লাভ করে এবং প্রায় ৯০ লাখ রুপি আয় করে, যা তাঁর তারকাখ্যাতির এক বড় প্রমাণ।
অকাল পতন:
তাঁর ঝলমলে জীবনের আকস্মিক পরিসমাপ্তি ঘটে ১৯৮৫ সালের ২২ জুলাই। একটি অগ্নি দুর্ঘটনায় তিনি গুরুতরভাবে দগ্ধ হন। তাঁর শরীরের প্রায় ৮০% পুড়ে গিয়েছিল বলে জানা যায় । এই ভয়াল দুর্ঘটনার পর তিনি প্রায় ১০ থেকে ১১ দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়েছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত জীবন যুদ্ধে হেরে যান। মাত্র ২৬ বছর (মতান্তরে ২৭ বছর) বয়সে এই পৃথিবীতে বিদায় নেন।বিবৃতি, বিতর্ক এবং পুলিশি তদন্ত :
প্রাথমিক বিবৃতি :
মহুয়ার মৃত্যুর ঘটনাটি প্রথম থেকেই রহস্যের জালে জড়ানো ছিল। দুর্ঘটনার পরপরই মহুয়া এবং তাঁর স্বামী তিলক চক্রবর্তী দুজনই পুলিশকে একই ধরনের জবানবন্দি দিয়েছিলেন। তাঁদের দাবি ছিল, ছেলের জন্য দুধ গরম করতে গিয়ে স্টোভ ফেটে যায় এবং সেই বিস্ফোরণের ফলে তাঁর গায়ে আগুন লাগে।পুলিশি তদন্ত :
কিন্তু এই বিবৃতিটি দ্রুতই প্রশ্নের মুখে পড়ে যখন পুলিশ ঘটনাস্থলে তদন্ত শুরু করে। পুলিশের তদন্তে যে সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো উঠে আসে, তা প্রাথমিক বিবৃতির সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তুলে ধরে। পুলিশ রান্নাঘর থেকে স্টোভটি অক্ষত এবং শুকনো অবস্থায় উদ্ধার করে । যদি স্টোভ বিস্ফোরণের কারণেই আগুন লেগে থাকত, তাহলে তার অক্ষত থাকা অসম্ভব ছিল। এই তথ্যটি সরাসরি ‘স্টোভ ফেটে যাওয়া’ তত্ত্বকে বাতিল করে দেয় এবং একটি মানবীয় হস্তক্ষেপের সম্ভাবনাকে জোরালো করে তোলে।হাসপাতালে বিবৃতি :
অধিকন্তু, মহুয়াকে যখন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন ডাক্তাররা তাঁর শরীর থেকে তীব্র কেরোসিনের গন্ধ পেয়েছিলেন। এই দুটি তথ্য একত্রিত করলে স্পষ্ট হয় যে আগুন কোনো প্রাকৃতিক দুর্ঘটনার কারণে লাগেনি, বরং এটি কোনো তরল দাহ্য পদার্থ ব্যবহারের মাধ্যমে ইচ্ছাকৃতভাবে লাগানো হয়েছিল।
ময়নাতদন্তের রিপোর্ট :
এই ঘটনার আরও গভীরতা বোঝা যায় ময়নাতদন্তের রিপোর্ট থেকে। রিপোর্টে মহুয়ার চোখ এবং পিঠের নীচে হেমাটোমার চিহ্ন পাওয়া যায়। এই আঘাতগুলি ইঙ্গিত দেয় যে আগুনের ঘটনার আগেই তাঁকে গুরুতরভাবে মারধর করা হয়েছিল। এই শারীরিক আঘাতের চিহ্ন এবং তিলকের গোঁড়ালি মচকে যাওয়ার ঘটনা তাঁদের মধ্যে একটি শারীরিক সংঘাতের প্রমাণ দেয়। এই সংঘাতটি কি স্রেফ একটি পারিবারিক ঝগড়ার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল, নাকি এটিই আগুনের ঘটনার মূল কারণ ছিল, তা আজও অমীমাংসিত।আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত তথ্য :
এই রহস্যের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আর্থিক লেনদেন। পুলিশ তদন্তে জানতে পারে যে মহুয়া, তাঁর স্বামী এবং বাবার সঙ্গে একাধিক যৌথ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছিল, যাঁর মধ্যে একটি দুর্ঘটনার মাত্র চার দিন আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এই অস্বাভাবিক আর্থিক কার্যকলাপের কারণ কী ছিল এবং এটি কি ঘটনার সঙ্গে কোনোভাবে সম্পর্কিত ছিল, সেই প্রশ্নগুলোও অমীমাংসিত রয়ে যায়।পরিচিতজনের বিবৃতি :
মাধবী মুখোপাধ্যায়ের মতো ব্যক্তিত্ব, যিনি এই ঘটনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত ছিলেন, তিনি আত্মহত্যার সম্ভাবনাকে সরাসরি নাকচ করে দিয়েছিলেন। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে, “আত্মহত্যা হলে গায়ে আগুন লাগবে সামনে দিয়ে, পিছন দিয়ে লাগবে না। আমাদের কারও দশটা হাত নেই” । যেহেতু মহুয়ার পিঠের অংশেও দগ্ধ হওয়ার চিহ্ন ছিল, তাই এটি দুর্ঘটনা বা আত্মহত্যার ধারণাকে বাতিল করে দেয় এবং হত্যাকাণ্ড বা কোনো তৃতীয় পক্ষের অংশগ্রহণের দিকে ইঙ্গিত করে।রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার গুজব :
এই সমস্ত পরস্পরবিরোধী তথ্য ও প্রমাণ সত্ত্বেও, তদন্ত হঠাৎ করেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এমনকি তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর এই মামলায় সংশ্লিষ্টতার গুজবও শোনা গিয়েছিল, যা এই মামলার রাজনৈতিক প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়।
ব্যক্তিগত জীবন ও দ্বন্দ্ব :
স্বামীর সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি :
পর্দার উজ্জ্বল জীবনের আড়ালে মহুয়ার ব্যক্তিগত জীবন ছিল গভীর ট্র্যাজেডি ও হতাশায় পূর্ণ। তাঁর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাওয়ার পর স্বামী তিলক চক্রবর্তীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের অবনতি ঘটেছিল বলে জানা যায়। গণমাধ্যমের খবরে উঠে আসে যে তিলক তাঁর স্ত্রীর প্রতি সন্দেহপ্রবণ ছিলেন এবং নিয়মিত তাঁকে শারীরিক নির্যাতন করতেন। মহুয়াকে এই মারধরের দাগ মেকআপ দিয়ে ঢেকেই অভিনয় করতে হতো।গণমাধ্যমের সংবাদ
তদন্তে এবং গণমাধ্যমে মহুয়ার মদ্যপান এবং একাধিক পুরুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগও প্রকাশিত হয়েছিল । এসব অভিযোগ স্বামী তিলকের সন্দেহকে আরও বাড়িয়ে তোলে। পুলিশি তদন্তে জানা যায় যে মহুয়া এর আগেও একবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন । এই তথ্য তার ব্যক্তিগত জীবনের মানসিক চাপ এবং হতাশার গভীরতা প্রকাশ করে। এই পারিবারিক কলহ, শারীরিক নির্যাতন, মদ্যপান এবং কাজের চাপ—এই উপাদানগুলি মহুয়ার জীবনের একটি করুণ চিত্র তুলে ধরে, যা তার মৃত্যুকে কেবল একটি দুর্ঘটনার চেয়ে অনেক বেশি জটিল করে তোলে।গণমাধ্যমের রসালো গল্প :
গণমাধ্যমের ‘রসালো গল্প’ এবং পুলিশি তদন্তের ফলাফলের মধ্যে পার্থক্য করা গুরুত্বপূর্ণ; কারণ কিছু গুজব (যেমন ‘ছেলেকে মদ খাওয়াতেন’ বা ‘নীল ছবির চক্রে জড়িত’) কেবলই ভিত্তিহীন ছিল, কিন্তু পারিবারিক কলহ ও শারীরিক আঘাতের প্রমাণ পুলিশি তদন্তে প্রমাণিত হয়েছিল।
চলচ্চিত্র শিল্প ও পরিবারের প্রতিক্রিয়া :
চলচ্চিত্র শিল্পের উপর প্রভাব :
মহুয়া রায়চৌধুরীর অকাল মৃত্যুতে সমগ্র টলিউড শোকাহত হয়। অভিনেতা বিপ্লব চট্টোপাধ্যায় তাঁর মৃত্যু সংবাদ শুনে চমকে গিয়েছিলেন এবং বিশ্বাস করতে পারেননি যে তিনি এত মারাত্মক দগ্ধ হওয়ার পর বাঁচবেন। তাঁর মৃত্যুর পর দেবশ্রী রায়, রঞ্জিত মল্লিক, তরুণ মজুমদারের মতো চলচ্চিত্র জগতের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা টালিগঞ্জের এনটি ওয়ান স্টুডিওতে উপস্থিত হয়েছিলেন। বিপ্লব চট্টোপাধ্যায় মহুয়ার অকাল মৃত্যুতে টলিউডের এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে বলে মনে করেন ।মৃত্যুর সময় মহুয়ার হাতে প্রায় ১৫ থেকে ২২টি চলচ্চিত্রের কাজ ছিল, যার মধ্যে মাত্র ৪টি শেষ করতে পেরেছিলেন । তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর অনেক অসমাপ্ত ছবি মুক্তি পায়, যা বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য এক করুণ অধ্যায় ছিল। এই চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল অনুরাগের ছোয়া, প্রেম ও পাপ, অভিমান, আশীর্বাদ, কেনরাম বেচারাম এবং আবির।
পরিবারের উপর প্রভাব :
মহুয়ার মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের জীবনও সম্পূর্ণরূপে বদলে যায়। মৃত্যুর আগে মহুয়া তাঁর বান্ধবী রত্না ঘোষালকে বলেছিলেন, “গোলাকে রেখে গেলাম, তোমরা দেখো”। তাঁর ছেলে তমাল চক্রবর্তী তখন মাত্র আট বছর বয়সী ছিল। তমালের বাবা তিলক চক্রবর্তী এরপর আর দ্বিতীয় বিয়ে করেননি এবং ছেলেকে একা হাতে বড় করেছেন। তিনি মঞ্চ থেকে সরে গিয়ে প্রায় অন্তরালে জীবন কাটিয়েছেন । তমাল চক্রবর্তী নিজের পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তিনি প্রথমে একজন অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন। পরে একজন গিটারিস্ট ও সঙ্গীত অ্যারেঞ্জারে পরিণত হন। তাঁর মায়ের পরিচয়কে তিনি কখনো প্রকাশ্যে আনতে চান না এবং এই বিতর্কিত বিষয়ে কথা বলতেও অনিচ্ছুক। কারণ, এই ঘটনা তার দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ এবং যন্ত্রণার প্রতিফলন বলে মনে করা হয়।উপসংহার:
মহুয়া রায়চৌধুরীর মৃত্যু কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি ছিল না, বরং এটি ছিল একটি বহুমাত্রিক রহস্য, যেখানে প্রাথমিক বিবৃতির সঙ্গে পুলিশি প্রমাণের কোনো মিল ছিল না। প্রাথমিক ‘দুর্ঘটনা’ তত্ত্বটি স্টোভের অক্ষত অবস্থা এবং তাঁর শরীর থেকে কেরোসিনের গন্ধের কারণে সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণিত হয়। ময়নাতদন্তে পাওয়া শারীরিক আঘাতের চিহ্ন এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেকার প্রচণ্ড কলহ এই ঘটনার পেছনে একটি সহিংস সংঘাতের ইঙ্গিত দেয়।
যদিও সমস্ত তথ্য একটি গুরুতর সন্দেহের দিকে ইঙ্গিত করলেও, কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। কেন স্টোভটি অক্ষত ছিল? তাঁর শরীরে আঘাতের চিহ্ন কেন ছিল? কেন তদন্ত হঠাৎ করেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল? এবং জ্যোতি বসুর মতো তৎকালীন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সংশ্লিষ্টতার গুজব কি কোনো প্রভাবশালী হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত দেয়? —এই প্রশ্নগুলো আজও অমীমাংসিত। মহুয়া রায়চৌধুরীর অকাল প্রয়াণ আজও বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হিসেবে রয়ে গেছে। এটি এক অমীমাংসিত প্রশ্নচিহ্ন, যা বাংলা সংস্কৃতির গভীরতায় তাঁর অকাল মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানের এক চিরন্তন অনুরণন তৈরি করে।
------------xx-----------
উল্লেখযোগ্য তথ্যপঞ্জি :
১) পুড়ে মারা গেছিলেন মহুয়া রায়চৌধুরী, দুর্ঘটনা না ষড়যন্ত্র; আজও রহস্য - আজতক বাংলা।২) উইকিপিডিয়া।
৩) আগুনে ঝলসে রহস্যমৃত্যু, মায়ের নাম মুখে আনে না ..., হিন্দুস্তান টাইম, বাংলা।
৪) আত্মহত্যা না কি..., মহুয়া রায়চৌধুরীর অস্বাভাবিক মৃত্যু ... - Inscript,
৫) ছেলেকে মদ খাওয়াতেন? একাধিক পুরুষাসক্তি ..., আজ তক বাংলা।
৬) বিপ্লব চক্রবর্তী সাক্ষাৎকার ..., আজকাল।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন