তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রয়াণ দিবস
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রয়াণ দিবস :
Death anniversary of Tarashankar Banerjee
১৯৭১ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রয়াণ দিবস। তিনি একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কথা সাহিত্যিক। আরোগ্য নিকেতন উপন্যাসের জন্য ১৯৫৫ সালে পেয়েছিলেন রবীন্দ্র পুরস্কার এবং গণদেবতা উপন্যাসের জন্য ১৯৬৭ সালে পেয়েছিলেন জ্ঞানপীঠ পুরস্কার। ১৯৭১ সালে তিনি সাহিত্যের নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন।
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয় :
১৮৯৮ সালের ২৩ জুলাই অবিভক্ত ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত বর্তমান বীরভূম জেলার লাভপুর গ্রামের এক ছোট জমিদার পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতার নাম ছিল হরিদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মায়ের নাম প্রভাবতী দেবী।
১৯১৬ সালে তিনি উমা ষষ্ঠী দেবীর সঙ্গে বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হন। দুই পুত্র সন্তান এবং তিনজন কন্যা সন্তানের পিতা ছিলেন তিনি। ১৯১৮ সালে জন্মান বড় ছেলের সনৎকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৯২২ সালে সরিৎকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম। তিন কন্যার মধ্যে গঙ্গা বন্দ্যোপাধ্যায় জন্মান ১৯২৪, বুলু জন্মান ১৯২৬ এবং কনিষ্ঠ কন্যা বাণীর ১৯৩২ সালে।
শিক্ষাজীবন :
১৯১৬ সালে মেট্রিক পাশ করেন লাভপুরের যাদবলাল এইচ ই স্কুল থেকে। এরপর উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য কলকাতায় আসেন। ভর্তি হন সেন্ড জেভিয়ার্স কলেজে। পরে কলেজ পরিবর্তন করে আসেন সাবআর্বান কলেজ যা বর্তমানে আশুতোষ কলেজ নামে পরিচিত। কিন্তু স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ ও ভগ্নস্বাস্থ্যের কারণে তিনি লেখাপড়া সম্পন্ন করতে পারেনি।
কর্মজীবন :
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ৬৫টি উপন্যাস, ৫৩টি ছোটোগল্প-সংকলন, ১২টি নাটক, ৪টি প্রবন্ধ-সংকলন, ৪টি স্মৃতিকথা, ২টি ভ্রমণকাহিনি, একটি কাব্যগ্রন্থ এবং একটি প্রহসন রচনা করেন।
স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে :
বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সময় তাঁর মনে দেশপ্রেমের চেতনা জন্ম নেয়। সে সময় রডা কোম্পানির অস্ত্র রাখার অপরাধে গ্রেপ্তার হওয়া দুকড়িবালা দেবীকে দেখতে যান রামপুরহাটে। পথে পরিচয় হয় বিপ্লবী নলিনী বাগচীর সঙ্গে। তিনি তাঁর মধ্যে ‘দেশপ্রেমের বহ্নিকণা’ জাগিয়ে তোলেন। ফলে গান্ধীজীর তিনি অসহযোগ আন্দোলনে।। এ সময় তিনি ‘অহিংস অসহযোগের আদর্শগত রোমান্টিকসিজম’ দ্বারা প্রবলভাবে আকৃষ্ট হন এবং জাতীয় কংগ্রেসের সদস্যপদ গ্রহণ করেন।
১৯২৯ সালে লাভপুর ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তার কলমের আচরে তৈরি চরিত্র দেবনাথ ঘোষের স্বপ্নের মতই তারাশঙ্কর এসময় গ্রামের মানুষের উন্নতির জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেন।
রাজনৈতিক দর্শনের পরিবর্তন :
কিন্তু ১৯২৯ সালের ডিসেম্বর মাসে কংগ্রেসের লাহোর অধিবেশনে পূর্ণ স্বরাজের দাবি স্বীকৃতি লাভ করে। সিদ্ধান্ত হয় ১৯৩০ সালের ২৬ শে জানুয়ারি সারা ভারতে স্বাধীনতার দাবিতে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে এবং পাঠ করা হবে স্বাধীনতার সংকল্প। এই সিদ্ধান্তকে কার্যকরী করতে নানান প্রতি কলতা জয় করে তিনি লাভপুর গ্রামের বাইরে একটি পতিত জমিতে অনুষ্ঠান আয়োজন করেন। তাঁর নেতৃত্বে উপস্থিত গ্রামবাসীরা স্বাধীনতার সংকল্প এবং পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি জানায়। এই কর্মকাণ্ডের অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং চার মাস জেলে কাটাতে হয়।
এই সময় তৎকালীন রাজনৈতিক নেতাদের সম্বন্ধে তাঁর মোহ মুক্তি ঘটে। পরিবর্তন ঘটে যায় তাঁর স্বাধীনতা সম্পর্কিত ধারণা ও।
সাহিত্যকর্মে পরিবর্তিত ভাবনার প্রকাশ :
তাঁর এই পরিবর্তিত ভাবনাচিন্তার বই প্রকাশ ঘটে ১৯৩৯ সালের প্রকাশিত ধাত্রী দেবতা উপন্যাসে। এই উপন্যাসে তিনি একজন প্রাক্তন বিপ্লবী চরিত্র শিবনাথের মুখ দিয়ে প্রকাশিত হয় সেই কথা। তিনি লেখেন, “ইংরেজ তাড়ানোর নামই স্বাধীনতা নয়”। তাঁর মতে, প্রকৃত স্বাধীনতার অর্থ হল সমস্ত দেশবাসীর উন্নয়ন। কিছু মানুষের বিশেষ স্বার্থ পূরণ করার জন্য স্বাধীন ভারতের সরকার প্রতিষ্ঠা করা নয়।
নাগরিক সমাজে স্পষ্ট রাজনৈতিক মতপার্থক্য এবং বিবাদ দেখে তিনি ব্যথিত হন। তার এই ব্যথার বহিঃপ্রকাশ দেখি ১৯৬৩ সালের ১০ই আগস্ট ‘গ্রামের চিঠি’র মধ্যে। তিনি লিখেন, “ভগবান কানা হইয়া বসে আছে। আর আমাদের স্বাধীন নেকনেও (কপালের লিখনেও) আগুন লাগিয়াছে।”
এই আগুন লাগার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন পল্লীসমাজ এবং গণদেবতার মত বিখ্যাত উপন্যাসের মাধ্যমে। ‘পল্লী সমাজে’র গোবিন্দ গাঙ্গুলী এবং ‘গণদেবতা’র ছিরু পাল ও তাদের অনৈতিক আধিপত্য এবং কর্তৃত্বকে দায়ী করে তিনি লিখেছেন, “সমাজ বিষয় রাজনৈতিক ক্ষেত্র যেখানে অর্থ আছে প্রতিপত্তি আছে ভোট দখলের ব্যাপার আছে। সেখানেই তাহারা জাকিয়া বসিয়াছে।” তার কথায়, কংগ্রেস কমিউনিস্ট দক্ষিণপন্থী বামপন্থী দল হিসেবে তফাৎ কিছুই নাই। সর্বত্রই ইহারা কিলবিল করিতেছে” এবং “ক্ষুদার্থ নরখাদক ব্যাগ্রের মতো হইয়া খাইতেছে, ধ্বংস করিতেছে পিতৃ-পিতামহের কীর্তি। দেশের জনহিতকর প্রতিষ্ঠানগুলিতে ইহারা কর্তা সাজিয়া প্রতিষ্ঠানের সদ্দুদ্দেশ্য ব্যর্থ করিয়া নিজেদের পেট ভরাইতেছে। ইস্কুলে ইহারা ম্যানেজিং কমিটির মেম্বার; হাসপাতালেও ইহারা; গ্রামের অধ্যক্ষ ইহারা; প্রধানও ইহারা।”
স্বাধীনতার ৭৯ তম বছর উদযাপনের সময়ও কি আমরা কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের আক্ষেপকে মুছে দিতে পেরেছি? যদি না পারি, এ স্বাধীনতা তবে কার?
আরোগ্য নিকেতন উপন্যাসের জন্য তারাশঙ্কর ১৯৫৫ সালে রবীন্দ্র পুরস্কার ও ১৯৫৬ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার এবং ১৯৬৭ সালে গণদেবতা উপন্যাসের জন্য জ্ঞানপীঠ পুরস্কার অর্জন করেন। এছাড়া ১৯৬২ সালে তিনি পদ্মশ্রী এবং ১৯৬৮ সালে পদ্মভূষণ সম্মান অর্জন করেন। ১৯৭১ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন।[১]

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন