চীনের বিজয় দিবস
চিনের বিজয় দিবস
Victory Day of China
১৯৪৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর। চিনের বিজয় দিবস। ১৯৪৫ সালের আগস্ট মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাপানের উপর পরমাণু বোমা আক্রমণ করে। জাপানের দুটি শহর হিরোশিমা ও নাগাসাকি বিধ্বস্ত হয়। জাপান বাধ্য হয় মিত্রশক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করতে। ১৯৪৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর এভাবেই শেষ হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও দ্বিতীয় চিন-জাপান যুদ্ধ। স্বাক্ষরিত হয় মিত্রশক্তির সঙ্গে অক্ষশক্তির চুক্তি যা চিনের কাছে বিজয়পত্র নামে পরিচিত। এই বিজয়পত্রে মিত্রশক্তির সঙ্গে তৎকালীন চীন সরকারও (ন্যাশনালিস্ট সরকার) সই করেন। তখন থেকেই চিন ৩ সেপ্টেম্বরকে জাপানের বিরুদ্ধে ‘বিজয় দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে।
আরও পড়ুন : চিনের স্বাধীনতা দিবস
বস্তুত, চিনের বিজয় দিবস হল এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা, যা চিনের জনগণের প্রতিরোধ যুদ্ধ এবং বিশ্ব ফ্যাসিবাদ-বিরোধী যুদ্ধের মহান বিজয়কে স্মরণ করে পালন করা হয়।১. পটভূমি ও গুরুত্ব :
· চিনের জনগণের প্রতিরোধ যুদ্ধ ১৯৩৭ সালের ৭ জুলাই লুগৌ সেতু ঘটনার মাধ্যমে শুরু হয় ।· এই যুদ্ধে চিনের জনগণ ১৪ বছর ধরে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম করে এবং ১৯৪৫ সালে জাপানি আগ্রাসনকারীদের পরাজিত করে বিজয় অর্জন করে ।
· এই বিজয় শুধুমাত্র চিনের জাতীয় স্বাধীনতা এবং জনগণের মুক্তিই রক্ষা করেনি, বরং বিশ্বশান্তি এবং উন্নয়নেও তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রেখেছে ।
· এই যুদ্ধে চিনের সামরিক এবং বেসামরিক নাগরিক হতাহতের সংখ্যা ৩৫ মিলিয়ন ছাড়িয়ে যায়, যা চিনের জনগণের দেশপ্রেম এবং আত্মত্যাগের প্রতীক হয়ে উঠেছে ।
২. বিজয় দিবসের তারিখ এবং পালন
· প্রতিবছর ৩ সেপ্টেম্বর চিনের বিজয় দিবস হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে ।· ২০২৫ সালে চিন বিজয় দিবসের ৮০তম বার্ষিকী পালন করেছে, যাতে একটি বড় সামরিক প্যারেড ও কুচকাওয়াজ আয়োজন করা হয় ।
· এই দিনে চিনের জনগণ বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করে, যেমন দেশাত্মবোধক গান, যুদ্ধের প্রবীণ যোদ্ধাদের স্মরণ, জাদুঘর পরিদর্শন ইত্যাদি, যাতে বীরদের বীরত্বের কথা স্মরণ করা হয় এবং দেশপ্রেমের চেতনা বিকাশে সাহায্য করে।
৩. সামরিক parade এবং আন্তর্জাতিক participation
· ২০২৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর বেইজিংএর থিয়েন-আন-মেন চত্বরে一 সামরিক প্যারেড আয়োজন করা হয়, যাতে ৪৫টি পদাতিক এবং বিমান বাহিনীর দল অংশ নেয়।· এই প্যারেডে চিনর আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম, প্রযুক্তি প্রদর্শিত হয়। প্রতিষ্ঠিত হয় সামরিক সাঁজোয়া ট্যাঙ্ক এবং ড্রোন বিধ্বংসী ব্যবস্থা (এন্টি ড্রোন সিস্টেম)।
· এই প্যারেডে প্রায় ২৬ টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন, যাদের মধ্যে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন, বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার লুকাশেঙ্কো, ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট লুয়ং কুয়ং, ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোয়ো সুবিয়ান্তো উল্লেখযোগ্য।
· বাংলাদেশ থেকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান উপস্থিত ছিলেন, যা বাংলাদেশ এবং চীনের মধ্যে এটি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ।
৪. শান্তি এবং বৈশ্বিক সহযোগিতার বার্তা :
· চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বিজয় দিবসের ইতিহাস স্মরণ, শহীদদের সম্মান এবং শান্তিকে ভালোবাসার দিন ঘোষণা করেন।· তিনি বলেন যে চিন সর্বদা শান্তিপূর্ণ উন্নয়নের পথে চলবে এবং বিশ্বের সকল দেশের সঙ্গে মিলেমিশে একটি ‘মানবতার জন্য অভিন্ন ভবিষ্যতের সমাজ’ গঠনে কাজ করে যাবে।
· এই প্যারেড অনুষ্ঠানে ৮০,০০০ কবুতর এবং ৮০,০০০ বেলুন উড়িয়ে শান্তির বার্তা প্রদান করা হয়, যা শান্তির প্রতি চিনের দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
৫. আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতির উপর প্রভাব :
· এই বিজয় দিবসের উদযাপন এবং কুচকাওয়াজ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতির উপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে ভারত ও চীনের মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব রয়েছে।· ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না, যা বর্তমান ভারত-চায়না সম্পর্কের মধ্যে একটা চ্যালেঞ্জ এবং উত্তেজনার প্রকাশ।
· এই অনুষ্ঠানে রাশিয়া, উত্তর কোরিয়া, এবং অন্যান্য দেশের নেতাদের উপস্থিতি একটি নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ গঠনের বহিঃপ্রকাশের ইঙ্গিত দেয়, যা পশ্চিমা দেশগুলোর দ্বারা ‘অস্থিতিশীলতার অক্ষ’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
৬. শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রভাব :
· বিজয় দিবস চিনের জনগণের জন্য একটি গভীর সাংস্কৃতিক এবং শিক্ষাগত তাৎপর্য বহন করে, যার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেম এবং আত্মত্যাগের শিক্ষা দেওয়া হয়।· বিভিন্ন জাদুঘর এবং ঐতিহাসিক স্থান গুলোতে এই দিন বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়, যাতে মানুষ যুদ্ধের ইতিহাস এবং তার গুরুত্ব ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারে।
৭. ভবিষ্যতের implication
· বিজয় দিবসেআয়োজন ও উদযাপন চিনের জাতীয় পুনর্জাগরণ এবং বিশ্বব্যাপী নেতৃত্বের উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রকাশ ঘটায়।· এই ইভেন্টের মাধ্যমে শান্তি ও সহযোগিতার বার্তা, বিশ্ব সম্প্রদায়ের সাথে চিনের সম্পৃক্ততা, কর্মক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়, যা আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উপসংহার
চিনের বিজয় দিবস ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক, এবং রাজনৈতিক গুরুত্ব, ত্যাগ এবং উত্সর্গের একটি ঘটনা,যা বিশ্বব্যাপী সহযোগিতার বার্তা প্রদান করে। এই দিবস উদযাপন, বিভিন্ন কার্যক্রম এবং অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে করা হয়, যা চিনের জাতীয় পরিচয় এবং বৈশ্বিক ভূমিকাকে তুলে ধরে ।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন