পলাশীর যুদ্ধের মূল ষড়যন্ত্রকারী
পলাশীর যুদ্ধের মূল ষড়যন্ত্রকারী :
পলাশীর যুদ্ধের কথা উঠলেই যে নামগুলো প্রথমেই উঠে আসে, তাদের মধ্যে প্রধান ব্যক্তি হচ্ছেন নবাবের প্রধান সেনাপতি মীরজাফর। মীর জাফর আলী খাঁ। এরপর যাদের নাম নিয়ে মোটামুটি চর্চা হয় তারা হলেন নবাবের কোষাধ্যক্ষ জগৎ শেঠ, মন্ত্রী রায় দুর্লভ বা দুর্লভ রাম (রাজা মহেন্দ্র), রাজা রামনারায়ণ, রাজা কৃষ্ণ দাস এবং তাঁর পিতা ঢাকার দেওয়ান রাজা রাজবল্লভ, উমি চাঁদ, খোজা বাজিদ, ঘসেটি বেগম প্রমুখ। প্রকৃতপক্ষে এঁরা সকলেই ছিলেন পলাশীর যুদ্ধে নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী। এঁরাই মূলত নবাবকে সিংহাসনচ্যুত করার জন্য প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে ইংরেজদের সহযোগিতা করেছিলেন। যার ফল হয়েছিল প্রায় ২০০ বছরের ব্রিটিশ শাসন ও তাদের অসহনীয় শোষণ ও নির্যাতনে ভারতীয় জনসমাজের শোচনীয় এবং করুণ পরিণতি।
আরও পড়ুন : পলাশীর যুদ্ধের কারণ ও ফলাফল
কিন্তু আশ্চর্যের হলেও সত্যিই, এই ‘ষড়যন্ত্রের প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে খ্যাত মানুষটির নামই ইতিহাসের পাতায় পাওয়া যায় না। ইতিহাসের পাতা বলতে এখানে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তক-এর কথা বলা হচ্ছে। উল্টে এখন তাকে ‘বাঙালি জাতির রক্ষাকর্তা’ বানানোর চেষ্টা হচ্ছে। আপনি কি জানেন এই ষড়যন্ত্রকারী আসলে কে? কেন তিনি এই ষড়যন্ত্র করেছিলেন?
কেমব্রিজ ঘরানার ইতিহাস গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ঐতিহাসিক রজতান্ত রায় তাঁর ‘পলাশীর ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ’ গ্রন্থে এই ষড়যন্ত্রকারীকে এভাবে বর্ণনা করেছেন— “নানা দিক থেকে এই বিদ্যানুরাগী কবিগুণগ্রাহী দেবদ্বিজ পন্ডিত প্রতিপালক রাজা গোটা সমাজের উপর তাঁর ধূর্ত-বুদ্ধি ও বিচক্ষণতার ছাপ রেখে গেছিলেন।.... লম্পট এবং নানা রকম কুরুচিপূর্ণ আমোদ প্রমোদের প্রবর্তক বলেও তাঁর একটা অখ্যাতি ছিল।”
অন্যদিকে, আশুতোষ মুখোপাধ্যায় তাঁর লেখা ‘জীবনী সন্দর্ভ, বঙ্গের কর্মবীরদের জীবনী সংগ্রহ’-তে তাঁকে একজন ব্রিটিশ অনুগামী রূপে বর্ণনা করেছেন।
আশুতোষ মুখোপাধ্যায় তাঁর গ্রন্থে লিখেছেন, “সিরাজ দুশ্চরিত্রতা ও নিষ্ঠুরতা নিবন্ধন শীঘ্রই লোকের অপ্রিয় হইয়া উঠিলেন এবং তাহার পদচ্যুত পরিবার অবসর সকলেই অনুসন্ধান করিতে লাগিলেন। ক্রমে এক ষড়যন্ত্রের আয়োজন হইল।” এরপর (নবাবের) কোষাধ্যক্ষ জগৎ শেঠ তাঁর বাড়িতে অন্যান্য ষড়যন্ত্রকারীদের নিয়ে বৈঠকে বসলেন। এই বৈঠকে জগৎ শেঠের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের বয়ান অনুযায়ী, ‘মন্ত্রী রায় দুর্লভ (রাজা মহেন্দ্র), রাজা রামনারায়ণ, রাজা কৃষ্ণ দাস ও তাহার পিতা রাজা রাজবল্লভ, সেনাপতি মীরজাফর, মীর মদন, উমি চাঁদ, খোঁজা বাজিদ’ প্রমূখ। এই বৈঠকের সিদ্ধান্ত হয়, এ বিষয়ে নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পরামর্শ নেওয়া হবে।
আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের মতে, পরবর্তী বৈঠকে এই ষড়যন্ত্রকারীরা সিরাজ কর্তৃক প্রাণদণ্ড দেওয়ার ভয়ে নবাবের বিরুদ্ধে কেউ বিদ্রোহ করতে পারছিলেন না। কিন্তু এ বিষয়ে একমত হয়েছিলেন যে, “... এক্ষণে যবন কর্তৃত্বাধীন হিন্দু জাতির নিরাপদে বাস করা অসম্ভব হইয়া দাঁড়াইয়াছে, যাহাতে আর জবানের অধীন না থাকিতে হয় ইহারই মন্ত্রণা করা কর্তব্য। এই প্রস্তাবে কেহ অনুমোদন কেহ বা প্রতিবাদ করিতে লাগিলেন। কিন্তু কিছুই স্থির সিদ্ধান্ত হইল না।” এই সময় রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের বক্তব্য ছিল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের বয়ান অনুযায়ী, এই সময় কৃষ্ণচন্দ্র নাকি বলেন, “তখন কৃষ্ণচন্দ্র বলিলেন যদি আমার মতামত জানিতে চাহেন তাহা হইলে শ্রবণ করুন। যবন আধিপত্যে আমাদিগকের নিরাপদে বাস করা একপ্রকার অসম্ভব এবং হিন্দুরাজা হইবারও কোন সম্ভাবনা নাই। কারণ সকলেই শক্তিহীন। এ স্থলে যদি মীরজাফর সহায়তা করেন, তাহা হইলে আমার জমিদারির মধ্যে কলিকাতার যে সকল ইংরেজ বণিক বাস করেন, তাহারা মনে করিলে এ দেশ রক্ষা করিতে পারেন। আমি তাদের রীতি-নীতি, স্বভাব চরিত্র উত্তম রূপে অবগত আছি। তাহারা যেমন পরাক্রান্ত ও সাহসী, তেমনি বুদ্ধিমান ও বিশ্বস্ত। যদি ইংরেজ রাজা হন, তাহা হইলে দেশের মঙ্গল, ইংরেজ নামমাত্র রাজা থাকিবেন এবং মীরজাফরই নবাব হইবেন। এইরূপ হইলে আমাদের সুখ-শান্তিতে কালযাপন হইবে। যদি আপনাদের ইহাতে মত হয় তাহা হইলে আমি ইংরেজদের নিকট বিষয় প্রস্তাব করি...।”
রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের এই মতামত মীরজাফর সহ সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়। এবং কৃষ্ণচন্দ্র কলকাতায় ফিরে কলকাতার কুঠিরের অধ্যক্ষ ড্রেক সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এই সাক্ষাৎকারের সময় রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ড্রেক সাহেবের সঙ্গে সবিস্তার বর্ণনা করেন এবং বলেন, “আমাদের সকলকার ইচ্ছা, ইংরেজ রাজা হইয়া এ হতভাগ্য দেশে শান্তি স্থাপন করেন।” আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য অনুযায়ী ড্রেক রাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে আশ্বস্ত করেন এবং বলেন, “শীঘ্রই ইহার প্রতিকার করিব।”
প্রশ্ন হল নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র এই ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন কেন?
নবদ্বীপ মহিমা নামক গ্রন্থে তিনি জানিয়েছেন জমিদারি প্রাপ্তির সময় নবাব আলীবর্দী খানের কাছে কৃষ্ণচন্দ্রের পৈত্রিক ঋণ ছিল প্রায় কুড়ি লক্ষ টাকা। ঐতিহাসিক রজতন্ত্রের মতে, এই বকেয়া ঋণের পরিমাণ ছিল ১২ লক্ষ টাকা। এখানে উল্লেখ্য, মারাঠা আক্রমণ বা বর্গির হাঙ্গামা মোকাবেলা করতে নবাব আলীবর্দীকে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়েছিল। ফলে রাজ কোষে ঘাটতি দেখা দেয়। এই পরিস্থিতিতে বাংলার বিভিন্ন জমিদারের কাছ থেকে বকেয়া রাজস্ব আদায়ের উপর জোর দেওয়া হয়। রাজা কৃষ্ণচন্দ্র এই অর্থ দিতে অস্বীকার করায় তাকে বন্দী করা হয়। রজতান্তের মতে তিনি দুবার জেল খাটেন। শেষ পর্যন্ত মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পান।
নবদ্বীপ মহিমার লেখক কান্তিচন্দ্র রাঢ়ীর মতে, সেই থেকে নবাবের প্রতি তাঁর এক ধরনের আক্রোশ ছিল। তিনি লিখেছেন, “নবাবকে পদচ্যুত করিয়া ইংরেজদিগকে আনায়ন সম্বন্ধে যে ষড়যন্ত্র হয়, কৃষ্ণচন্দ্র তারই প্রধানমন্ত্রী বলিয়া উল্লিখিত হন।”
------------xx-----------

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন