চরম দারিদ্র’-মুক্ত রাজ্য কেরালা
‘চরম দারিদ্র’-মুক্ত রাজ্য কেরালা
A state free from ‘extreme poverty’
ভারতের প্রথম রাজ্য হিসেবে একশো শতাংশ স্বাক্ষরতার কৃতিত্ব আগেই অর্জন করেছিল কেরালা। বামশাসিত ‘গডস ওন কান্ট্রি’ ফের ইতিহাস গড়ল। দেশের প্রথম রাজ্য হিসেবে ‘চরম দারিদ্র’-মুক্ত কেরালা— শনিবার রাজ্য বিধানসভায় এই ঘোষণা করলেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন। এ দিনই ছিল কেরালার ৬৯তম প্রতিষ্ঠা দিবস। কেরালা আদতে বিশ্বের মধ্যে দ্বিতীয় হিসেবে এই কৃতিত্ব অর্জন করল বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, ২০২০-তে চিন ঘোষণা করেছিল যে, তাদের প্রতিটি প্রদেশই চরম দারিদ্র-মুক্ত। কেরালাকে এ দিন অভিনন্দন জানান ভারতে নিযুক্ত চিনা রাষ্ট্রদূত শু ফেইহং। কেরালার দাবি ঘিরে অবশ্য প্রশ্ন উঠেছে।
রাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার ৬৮-তম বার্ষিকীতে কেরালা সরকার এই সাফল্য অর্জনের ঘোষণা করলো। ঘোষণা করলো, এখন থেকে কেরালা চরম দারিদ্র্য থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। মুখ্যমন্ত্রী বিজয়ন বলেন, “নব কেরলাম (নতুন কেরালা) উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য কেরালার জীবনমানকে উন্নত দেশগুলির সমতুল্য করা, যা এখন আর দূরে নয়।” তাঁর কথায়, “আমাদের অর্থনীতি আমেরিকার তুলনায় ০.৫৫ শতাংশ। তবুও অনেক ক্ষেত্রে আমরা আমেরিকাকে ছাপিয়ে গিয়েছি। এটাই আসল ‘কেরালা স্টোরি’।
“আমাদের অর্থনীতি আমেরিকার তুলনায় ০.৫৫ শতাংশ। তবুও অনেক ক্ষেত্রে আমরা আমেরিকাকে ছাপিয়ে গিয়েছি। এটাই আসল ‘কেরালা স্টোরি।”
মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তুলনামূলক পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। তিনি বলেন—
- মায়ের মৃত্যু হার : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ১ লক্ষ জন্মে ২২.৩ জন মা মারা যান। অথচ কেরালায় সেই সংখ্যা মাত্র ১৮ জন।
- শিশুর মৃত্যু হার : জন্ম মুহূর্তে শিশু মৃত্যুর হার আমেরিকায় ৫.৬ শতাংশ কেরালায় তা ৫ শতাংশ।
- সাক্ষরতার হার : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সাক্ষরতার হার ৭৯ শতাংশ, কেরালায় এই হার ৯৬.২ শতাংশ।
- বহুমাত্রিক দারিদ্রের : বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের পরিমাণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৫.৬৮ শতাংশ, কেরালায় এর পরিমাণ মাত্র ০.৫৫ শতাংশ।
জাতীয় স্তরেও কেরালার সাফল্য ঈর্ষা করার মতো। বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের হার যেখানে ১৪.৯৬ শতাংশ কেরালায় তা ০.৫৫ শতাংশ। উত্তরপ্রদেশে মাতৃ মৃত্যুর হার যেখানে প্রতি ১ লক্ষে ১৪১ জন, কেরালায় তা মাত্র ১৮ জন। মোদি সরকারের তৈরি নীতি আয়োগের তথ্য অনুযায়ী কেরালা রাজ্যের দারিদ্র্যের হার সারাদেশের সর্বনিম্ন। এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী কেরালা টেকসই উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার ক্ষেত্রে ভারতের প্রথম স্থান অধিকার করে আছে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, আজ আমরা যে চরম দারিদ্র্য নির্মূলের ঘোষণা করছি এটি কেরালার জনকেন্দ্রিক বিকল্প উন্নয়ন মডেলের জয়। তাঁর কথায় —
“যখন সারাদেশে উদারনীতিবাদী নীতিগুলি বৈষম্য বাড়িয়ে তুলছে এবং সম্পদ কেবলমাত্র অল্প কয়েকজনের হাতে জমা হচ্ছে, তখন কেরালা গর্ব করে বিশ্বের সামনে ঘোষণা করছে যে, সহানুভূতিশীল, সাম্যবাদী ও কল্যাণমুখী একটি সমাজ—যেখানে সবাইকে আপন করে নেওয়া হয়—তা সম্ভব।”
কীভাবে সম্ভব হলো :
কিন্তু কিভাবে এই দুঃসাধ্য সাধন করা সম্ভব হলো—এই প্রশ্নের উত্তরও দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী বিজয়ান। তাঁর ব্যাখ্যা হল—
- এই সাফল্য কেবল সরকারের সাফল্য নয়। এই মাটির প্রতিটি মানুষের সাফল্য।
- যারা ঐক্যবদ্ধভাবে সংকট মোকাবেলা করেছে এবং নব কেরালা এর স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। এই বিজয় কুদুম্বশ্রী কর্মীদের যারা তাদের আশপাশের চরম দরিদ্র পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করেছেন।
- সেই স্বেচ্ছাসেবকদের, যারা তাদের কাছে ঔষধ পৌঁছে দিয়েছেন। সেই সরকারি কর্মচারীদের, যারা জনগণের উদ্যোগে অংশ নিয়েছেন।
- এবং সেই সঙ্গে ২০২১ সালে পিনারায় বিজয়ান সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্ত, যেখানে কেরালাকে ‘চরম দারিদ্র্যমুক্ত রাজ্য’ হিসাবে ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সামাজিক স্তরে নানা উন্নতির জন্য ভারতের রাজ্যগুলির মধ্যে কেরালা সব সময়ই নজর কারা সাফল্য অর্জন করেছে। তাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উন্নত দেশগুলির সমতুল্য। কখনো কখনো তা ছাড়িয়েও গেছে। এমন সব সাফল্যের মুকুটে আরেকটি নতুন পালক হল এই চরম দারিদ্র মুক্ত (‘এক্সট্রিম পভার্টি ইরাডিকেশন প্রোগ্রাম’ বা EPEP)।
এই ইপিইপি প্রকল্পকে সফল করার জন্য শিক্ষিত গণনাকারী এবং কদম্বশ্রী কর্মীদের চূড়ান্ত দরিদ্র সনাক্তকরণে নিয়োগ করা হয়েছিল। সঙ্গে ছিল সরকার সমর্থিত স্থানীয় পরিকাঠামো। চূড়ান্ত স্তরে ৬৪ হাজার টি অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারকে সনাক্ত করা হয়। এই পরিবারগুলোর সদস্য সংখ্যা এক লক্ষ ৩ হাজার ৯৯ জন। খাদ্য, স্বাস্থ্য, বাসস্থান ও জীবিকার ভিত্তিতে তাদের সনাক্ত করা হয়। এমন বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের জন্য একক সমাধান সম্ভব নয় ফলে তাদের পরিচয় পত্র জীবিকা বাসস্থান নিত্য প্রয়োজনীয় ওষুধ, রান্না করা খাবার, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা যত্ন এবং ক্ষেত্রবিশেষে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের মত সাহায্য দেওয়া হয়েছে।
এক কথায়, স্থানীয় স্বশাসন বিভাগের নেতৃত্বে গঠিত গোষ্ঠীর অংশগ্রহণে এবং সব ধরনের সম্ভাবনার পূর্ণ সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে এই সাফল্য এসেছে।
সাফল্য ধরে রাখা :
মুখ্যমন্ত্রী বিজয়ন বলেন, আমরা শুধু আজকের সমস্যাগুলো সমাধান করছি না, আমরা আগামী প্রজন্মের জন্য একটি জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলছি, যা এই সাফল্যকে ধরে রাখতে সাহায্য করবে।
১) ইপিইপি ২.০ : কেরালা সরকার ইতিমধ্যেই ইপিইপি ২.০ প্রকল্পের সূচনা করেছে, যাতে দারিদ্র আর ফিরে না আসে।
২) পরিকাঠামোগত প্রকল্প ও উন্নত প্রযুক্তি : কেরালা সরকারে সমালোচকরা আর্থিক বৃদ্ধি না হওয়া এবং বেকারত্বকে দেখানোর চেষ্টা করে। এইসব অভাব পূরণের জন্য সরকার পরিকাঠামোগত প্রকল্প ও উন্নত প্রযুক্তির পরিবেশ বান্ধব শিল্পের কাজ শুরু করেছে।
৩) শিক্ষিতদের প্রশিক্ষণ : বেকারত্ব দূর করতে শিক্ষিতদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে।
৪) সামাজিক সুরক্ষার : ইতি ইতি সাফল্য থেকে বোঝা যাচ্ছে আর্থিক বৃদ্ধি ও জনকল্যাণের সমান্তরাল বন্দোবস্তের মধ্যেই সুশাসনের চাবি লুকিয়ে রয়েছে যেখানে সামাজিক সুরক্ষার সঙ্গে আপোষ করা হবে না
৫) গোষ্ঠীকেন্দ্রিক মডেল : এইসব গোষ্ঠীকেন্দ্রিক মডেল হয়তো নিখুঁত নয় কিন্তু এর জোর হল এই মডেল নিজে বিবর্তিত হতে পারে, গণতন্ত্রকে ও পুস্ত করতে পারে।
এভাবে পরিকল্পিত এবং জনগণকে সঙ্গে নিয়ে উন্নয়নের যে নতুন মডেল তুলে ধরা হয়েছে তা কতটা স্থায়ী হবে তা আগামীতে আরও পরিষ্কার হয়ে উঠবে।।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন