বিখ্যাত : তথ্য। তারিখ। মাস। বছর। বিষয়। ব্যক্তি খুঁজুন :

স্পুটনিক - ২ এর মহাকাশে (উৎক্ষেপণ) যাত্রা

স্পুটনিক - ২ এর মহাকাশে উৎক্ষেপণ / যাত্রা :

The launch of Sputnik-2 into space

১৯৫৭ সালের ৩ নভেম্বর। স্পুটনিক ২ এর মহাকাশ যাত্রা শুরু করে। ১৯৫৭ সালের আজকের দিনে বিশ্বের প্রথম মহাকাশ যাত্রী লাইকা মহাকাশে পাড়ি দেয়। লাইকা আসলে একটি কুকুর। পরীক্ষামূলকভাবে মানুষের পরিবর্তে এই কুকুরকে বেছে নেওয়া হয় মহাকাশ প্রাণের জন্য কতটা উপযুক্ত তা বোঝার জন্য। ঘটনা হল, উৎক্ষেপণের কয়েক ঘন্টা পর লাইকা মারা যায়।

স্পুটনিক ২ এর মহাকাশযাত্রা ও তার ভূ-রাজনৈতিক ও নৈতিক বিশ্লেষণ

I. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:

১৯৫৭ সালের ৩ নভেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়ন স্পুটনিক ২ উৎক্ষেপণ করে, যা ছিল পৃথিবীর কক্ষপথে পাঠানো দ্বিতীয় মহাকাশযান এবং প্রথম জীবন্ত প্রাণী বহনকারী যান। এই মিশনটি স্পুটনিক ১-এর ঐতিহাসিক সাফল্যের মাত্র এক মাস পরে সংঘটিত হয়েছিল এবং এর নকশা ও বাস্তবায়ন ছিল মূলত কঠোর রাজনৈতিক সময়সীমা এবং স্নায়ুযুদ্ধের কৌশলগত চাপের ফল।

A. স্পুটনিক ১-এর সাফল্য এবং ‘স্পুটনিক সংকট’

১৯৫৭ সালের ৪ অক্টোবর স্পুটনিক ১-এর উৎক্ষেপণ বিশ্বব্যাপী মনোযোগ আকর্ষণ করে এবং মহাকাশ প্রতিযোগিতায় সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রাথমিক বিজয় নিশ্চিত করে । এই প্রযুক্তিগত সাফল্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি গভীর জাতীয় আত্মবিশ্বাস সংকট, যা 'স্পুটনিক সংকট' নামে পরিচিত, সৃষ্টি করে । মার্কিন নীতিনির্ধারকরা উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন যে বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের এই চিত্র বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাদের তুলনায় কমিউনিজমকে আরও শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করবে, যা বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যকে সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে ঝুঁকিয়ে দিতে পারে ।

স্পুটনিক ২-এর উৎক্ষেপণ ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রযুক্তিগত ও সামরিক সক্ষমতার আরও একটি প্রমাণ। স্নায়ুযুদ্ধের সময় বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের জন্য উভয় পরাশক্তিই মহাকাশ অনুসন্ধানকে জাতীয় প্রতিপত্তি এবং সামরিক সক্ষমতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছিল । স্পুটনিক ২-এর মতো ভারী পেলোড বহনের সক্ষমতা প্রদর্শন করে, সোভিয়েত ইউনিয়ন ইঙ্গিত দিয়েছিল যে তারা আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক মিসাইল (ICBM) প্রযুক্তিতে দ্রুত উন্নতি করছে।

B. রাজনৈতিক সময়সীমার প্রভাব

স্পুটনিক ২ মিশনটি প্রিমিয়ার নিকিতা ক্রুশ্চেভের (Nikita Khrushchev) ব্যক্তিগত অনুরোধে তড়িঘড়ি করে পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ১৯৫৭ সালের ৭ নভেম্বর রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লবের ৪০তম বার্ষিকীর সাথে মিল রেখে একটি উড্ডয়ন সম্পন্ন করার রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা ছিল । এই কঠোর রাজনৈতিক সময়সীমা পূরণের জন্য প্রকৌশল দলগুলি তড়িঘড়ি করে কাজ শুরু করে, প্রায়শই যথাযথ নকশা বা ব্লুপ্রিন্ট ছাড়াই মহাকাশযানটি নির্মাণ করতে হয়েছিল ।

এই প্রেক্ষাপটে এটি স্পষ্ট হয় যে উৎক্ষেপণটি ছিল মূলত একটি প্রচারণামূলক বাধ্যবাধকতা। উৎক্ষেপণের তারিখ (৩ নভেম্বর) সরাসরি ৭ নভেম্বরের বার্ষিকীকে কেন্দ্র করে নির্ধারিত হয়েছিল । প্রকৌশলগত নির্ভরযোগ্যতার চেয়ে বৈশ্বিক প্রতিপত্তি এবং প্রতীকী বিজয় অর্জনই ছিল এই মিশনের প্রাথমিক চালিকাশক্তি। রাজনৈতিক চাপের কারণে জীবনধারণ ব্যবস্থার নকশা এবং পরীক্ষায় পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয়নি , যা শেষ পর্যন্ত তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং লায়কার করুণ মৃত্যুর দিকে চালিত করে ।
রাজনৈতিক তাড়াহুড়োর মধ্যেও প্রযুক্তিগত ধাপের যে উল্লম্ফন ঘটানো হয়েছিল, তা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। স্পুটনিক ২-এর পেলোড ভর (৫০৮.৩ কেজি বা ১,১২০ পাউন্ড ) স্পুটনিক ১-এর চেয়ে প্রায় ছয় গুণ ভারী ছিল । এই বিপুল ওজনের বস্তু কক্ষপথে স্থাপন করার সক্ষমতা প্রমাণ করে যে সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্রুত ভারী বস্তু (যেমন সামরিক ওয়ারহেড) মহাকাশে নিক্ষেপ করার ক্ষমতা অর্জন করেছে। এই প্রযুক্তিগত সক্ষমতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে 'ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবধান' (missile gap) নিয়ে ভয় আরও বাড়িয়ে তোলে ।

II. স্পুটনিক ২: নির্মাণ ও প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য

স্পুটনিক ২ মহাকাশযানটি বায়োঅ্যাস্ট্রোনটিক্সে একটি গুরুতর পদক্ষেপ ছিল, তবে এর নকশা স্নায়ুযুদ্ধের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং তাড়াহুড়োর ছাপ বহন করে।

A. উৎক্ষেপণ যান ও মহাকাশযানের নকশা

স্পুটনিক ২ উৎক্ষেপণের জন্য একটি পরিবর্তিত R-7 আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক মিসাইল (ICBM), যা SS-6 Sapwood রকেট নামেও পরিচিত, ব্যবহার করা হয়। PS-2 স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের জন্য পরিবর্তিত এই যানের পদবি ছিল 8K71PS । এটি ১৯৫৭ সালের ৩ নভেম্বর বাইকোনুর কসমোড্রোম (Baikonur Cosmodrome 1/5) থেকে উৎক্ষেপণ করা হয় ।

মহাকাশযানটি নিজেই ৪ মিটার উঁচু একটি শঙ্কু আকৃতির ক্যাপসুল ছিল, যার গোড়ার ব্যাস ছিল ২ মিটার । এর পেলোড ভর ছিল ৫০৮.৩ কেজি । স্পুটনিক ২-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ নকশা বৈশিষ্ট্য ছিল যে এটি কক্ষপথে পৌঁছানোর পরেও মূল রকেট কোর (core) থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার জন্য তৈরি করা হয়নি, ফলে কক্ষপথে মোট ভর প্রায় ৭.৭৯ টনে পৌঁছেছিল । মহাকাশযানটিতে রেডিও ট্রান্সমিটার, একটি ট্রাল (Tral) টেলিমেট্রি সিস্টেম, প্রোগ্রামিং ইউনিট, এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সহ বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির জন্য একাধিক বগি ছিল ।

নিম্নে স্পুটনিক ২ মিশনের প্রধান প্রযুক্তিগত পরামিতিগুলি তুলে ধরা হলো:

Table 1: স্পুটনিক ২ মিশনের প্যারামিটার এবং স্পেসিফিকেশন
পরামিতি (Parameter)
বিবরণ (Description)
উৎস (Source)
উৎক্ষেপণের তারিখ (Launch Date)
৩ নভেম্বর ১৯৫৭, ০২:৩০ UTC

উৎক্ষেপণ স্থল (Launch Site)
বাইকোনুর কসমোড্রোম ১/৫

রকেট (Launch Vehicle)
স্পুটনিক-পিএস ৮কে৭১পিএস (Sputnik-PS 8K71PS), পরিবর্তিত R-7 ICBM

পেলোড ভর (Payload Mass)
৫০৮.৩ কেজি (1,121 lb)

কক্ষপথের মোট সময়কাল (Total Mission Duration)
১৬২ দিন (২৫৭০টি কক্ষপথ সম্পন্ন)

পৃথিবীতে পুনরায় প্রবেশ (Re-entry Date)
১৪ এপ্রিল ১৯৫৮

কক্ষপথের বৈশিষ্ট্য (Orbital Parameters)
অ্যাপোজি ১,৬৪৯ কিমি; পেরিজি ২১২ কিমি; প্রবণতা 65.33^{\circ}

B. জীবনধারণ এবং বায়ো-পেলোড কম্পার্টমেন্ট

মিশনের প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল মহাকাশ ভ্রমণের জৈবিক প্রভাব বোঝা এবং ভবিষ্যতের মানব মহাকাশযাত্রার পথ প্রশস্ত করা । এর জন্য একটি পৃথক সিল করা কেবিন তৈরি করা হয়েছিল, যার মধ্যে লায়কাকে রাখা হয় । এই কেবিনে জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় রি-জেনারেটিং এয়ার সিস্টেম এবং একটি প্রাথমিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত ছিল।

ট্রাল টেলিমেট্রি সিস্টেমটি লায়কার অবস্থা এবং বৈজ্ঞানিক তথ্য পৃথিবীতে প্রেরণ করত । সংগৃহীত জৈব-ডাটাগুলির মধ্যে ছিল: শ্বাস-প্রশ্বাসের হার, কার্ডিওভাসকুলার চাপ, এবং কুকুরের ট্রে-এর সাথে তার নড়াচড়া পরিমাপ । উৎক্ষেপণের আগে, লায়কার কম্পার্টমেন্টটি বাইকোনুর কসমোড্রোমের শীতল তাপমাত্রার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য একটি বহিরাগত টিউবের মাধ্যমে গরম করা হয়েছিল ।

III. কুকুর লায়কা: নির্বাচনের প্রক্রিয়া ও প্রশিক্ষণ

লায়কা ছিল স্পুটনিক ২ মিশনের কেন্দ্রবিন্দু—প্রথম জীবন্ত প্রাণী যাকে পৃথিবীর কক্ষপথে পাঠানো হয় । তার নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং প্রস্তুতি ছিল মানব মহাকাশযাত্রার জন্য একটি কঠিন পরীক্ষা।

A. লায়কার নির্বাচন ও প্রস্তুতি

লায়কা ছিল মস্কোর পথচারী কুকুর (stray mongrel) এবং সম্ভবত হুস্কি-স্পিটজ মিশ্রণের । বিজ্ঞানীরা নারী কুকুরদের বেছে নিয়েছিলেন তাদের ছোট আকার এবং তুলনামূলকভাবে শান্ত আচরণের জন্য । লায়কা, যার ওজন ছিল প্রায় ৫ কেজি , তাকে তার ছোট আকার, মৃদু আচরণ এবং বিজ্ঞানীদের বিবেচনায় "ব্যয়যোগ্য" হওয়ার কারণে নির্বাচন করা হয়েছিল ।
মহাকাশ ক্যাপসুলের সীমাবদ্ধ অবস্থার সাথে অভ্যস্ত করার জন্য লায়কাকে কঠোর প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল, যার মধ্যে ছিল দিনের পর দিন ছোট খাঁচায় সীমাবদ্ধতা । এই কারাবাস এত চরম ছিল যে কুকুরদের স্বাভাবিক মলমূত্র ত্যাগের প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়েছিল । উৎক্ষেপণের জন্য তাকে একটি ফ্লাইট হারনেস পরানো হয় এবং পেলোডের সাথে সংযুক্ত করা হয় ।
এই মিশনের একটি কঠোর বিশ্লেষণ দেখায় যে জৈব-পেলোডকে প্রথম থেকেই ব্যয়যোগ্য বিবেচনা করা হয়েছিল। যেহেতু সেই সময়ে বায়ুমণ্ডলে পুনরায় প্রবেশের এবং পুনরুদ্ধার করার প্রযুক্তি তৈরি হয়নি , তাই মিশনটি শুরু থেকেই 'ওয়ান-ওয়ে ট্রিপ' হিসেবে ডিজাইন করা হয়েছিল । এই সিদ্ধান্তটি বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির জন্য প্রাণীর জীবনকে মেনে নেওয়ার নৈতিক ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এই নির্বাচনের প্রক্রিয়া প্রমাণ করে যে বিজ্ঞানীরা মানব মহাকাশযাত্রাকে একটি "প্রয়োজনীয়" ধাপ হিসেবে দেখেন, যা লায়কার দ্রুত মৃত্যু নিশ্চিত করে।

B. বৈজ্ঞানিক উদ্দেশ্য এবং ডেটা সংগ্রহ

মিশনের প্রাথমিক বৈজ্ঞানিক উদ্দেশ্য ছিল প্রমাণ করা যে একটি জীবিত স্তন্যপায়ী প্রাণী উৎক্ষেপণের ভয়াবহ চাপ সহ্য করে কক্ষপথে টিকে থাকতে পারে এবং ওজনহীনতার পরিস্থিতিতে শারীরবৃত্তীয়ভাবে কার্যক্ষম থাকতে পারে । এই পরীক্ষাগুলিই মানুষকে মহাকাশে পাঠানোর আগে প্রয়োজনীয় প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করার জন্য অপরিহার্য ছিল। ট্রাল টেলিমেট্রি সিস্টেম ব্যবহার করে তার শ্বাস-প্রশ্বাস, হৃদযন্ত্রের কার্যকলাপ এবং নড়াচড়ার ডেটা সংগ্রহ করা হচ্ছিল ।

এই মিশনে একটি গভীর মানবিক দিক দেখা যায়। যদিও লায়কাকে আত্মঘাতী মিশনে পাঠানো হয়েছিল, একজন মহিলা চিকিৎসক প্রোটোকল ভেঙে উৎক্ষেপণের আগে তাকে খাইয়েছিলেন । এই ছোট ঘটনাটি ইঙ্গিত দেয় যে প্রকল্পের সাথে জড়িত বিজ্ঞানীদের মধ্যে একটি অভ্যন্তরীণ নৈতিক সংঘাত ছিল—তাদের বৈজ্ঞানিক লক্ষ্য এবং একটি নির্দোষ প্রাণীর প্রতি ব্যক্তিগত সহানুভূতির মধ্যে সংঘর্ষ ।

IV. উৎক্ষেপণ, কক্ষপথের সূচনা এবং মারাত্মক ত্রুটি

১৯৫৭ সালের ৩ নভেম্বর স্পুটনিক ২ উৎক্ষেপণের সময় লায়কা মারাত্মক শারীরিক চাপের সম্মুখীন হয়।

A. উৎক্ষেপণ এবং প্রাথমিক চাপ

উৎক্ষেপণের সময় জি-ফোর্স স্বাভাবিক অভিকর্ষজ বলের পাঁচ গুণ পর্যন্ত পৌঁছেছিল । টেলিমেট্রি ডেটা অনুযায়ী, উৎক্ষেপণ এবং কক্ষপথে প্রবেশের সময় লায়কার পালস রেট এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গিয়েছিল, যা চরম স্ট্রেস নির্দেশ করে । যদিও উৎক্ষেপণের পরে প্রথম তিনটি কক্ষপথে (প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা) তার শ্বাস এবং হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক ছিল, অর্থাৎ প্রাথমিক চাপ তিনি সহ্য করতে পেরেছিলেন ।

B. মূল প্রযুক্তিগত ব্যর্থতা

কক্ষপথে পৌঁছানোর পর, মহাকাশযানে একটি গুরুতর প্রযুক্তিগত ত্রুটি দেখা দেয়। R-7 রকেটের কেন্দ্রীয় কোর (Blok A core), যাকে সাসটেইনারও বলা হয়, পরিকল্পনা অনুযায়ী পেলোড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়নি । এই বিচ্ছিন্নকরণ ব্যর্থতার কারণে অন-বোর্ড থার্মাল কন্ট্রোল সিস্টেম (তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা) সঠিকভাবে কাজ করতে পারেনি। অতিরিক্তভাবে, কিছু তাপ নিরোধক উপাদান ছিঁড়ে গিয়েছিল ।

এই যান্ত্রিক ব্যর্থতার ফলে ক্যাপসুলের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা দ্রুত এবং অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়তে থাকে। তৃতীয় কক্ষপথের সময়, কেবিনের তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে (109°F) পৌঁছে যায় ।

C. প্রযুক্তিগত ব্যর্থতার বিশ্লেষণ

এই মিশনটি প্রযুক্তিগত ব্যর্থতার দ্বৈত প্রকৃতি তুলে ধরে। সোভিয়েত ইউনিয়ন সফলভাবে একটি অত্যন্ত ভারী পেলোড (স্পুটনিক ১-এর চেয়ে ছয় গুণ বেশি) কক্ষপথে স্থাপন করে সামরিক রকেট প্রযুক্তি (R-7 ICBM) ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে । কিন্তু একই সাথে, জীবনধারণ প্রযুক্তি (বিশেষ করে তাপ নিয়ন্ত্রণ) এবং সিস্টেম বিচ্ছেদের নির্ভরযোগ্যতায় তারা পিছিয়ে ছিল । এই ব্যর্থতা প্রমাণ করে যে সামরিক সক্ষমতার দ্রুত বিকাশ বায়ো-মহাকাশ গবেষণার নির্ভুলতার প্রয়োজনীয়তার তুলনায় বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল।

এই প্রকৌশল ত্রুটি লায়কার ভাগ্যে এক অপ্রয়োজনীয় বিপদ নিয়ে আসে। বিজ্ঞানীরা মূলত আশা করেছিলেন যে লায়কা সাত দিন পরে অক্সিজেন স্বল্পতার কারণে তুলনামূলকভাবে ব্যথাহীনভাবে মারা যাবে । কিন্তু রকেট কোর বিচ্ছিন্ন না হওয়ায় সৃষ্ট তাপমাত্রা বৃদ্ধি লায়কার জীবনকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তীব্র যন্ত্রণাদায়ক হাইপারথার্মিয়ার মাধ্যমে শেষ করে দেয় । এই যান্ত্রিক ত্রুটি কেবল লায়কার মৃত্যুকে দ্রুত করেনি, বরং মিশনের নৈতিক ভারকেও বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছিল।

V. লায়কার শেষ পরিণতি: সত্য এবং প্রচার

লায়কার মৃত্যুর সময় এবং কারণ বহু দশক ধরে সোভিয়েত গোপনীয়তা ও প্রচারের আড়ালে ঢাকা ছিল।

A. মৃত্যুর প্রকৃত সময় এবং কারণ

প্রাথমিক টেলিমেট্রি ডেটা অনুযায়ী, উৎক্ষেপণের প্রথম প্রায় ৪.৫ ঘণ্টার মধ্যে লায়কা বেঁচে ছিল, কিন্তু উচ্চ তাপমাত্রার কারণে তার শারীরিক কার্যকলাপের ডেটা দ্রুত হারিয়ে যায় । লায়কা উৎক্ষেপণের মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরে, কক্ষপথের চতুর্থ চক্রের মধ্যে, অতিরিক্ত তাপমাত্রাজনিত কারণে (Hyperthermia) মারা গিয়েছিল । মিশনের অন্যতম বিজ্ঞানী দিমিত্রি মালাশেনকভ (Dimitri Malashenkov) ২০০২ সালে এই সত্য প্রকাশ করেন। তিনি স্বীকার করেন যে এত সীমিত সময়সীমার মধ্যে একটি নির্ভরযোগ্য তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তৈরি করা "কার্যত অসম্ভব" ছিল ।

উৎক্ষেপণের মাত্র ছয় দিন পরে, ১০ নভেম্বর, স্পুটনিক ২-এর ব্যাটারিগুলি নিঃশেষিত হয়ে যায় এবং মহাকাশযানটি পৃথিবীতে ডেটা ট্রান্সমিট করা বন্ধ করে দেয় । ডেটা ট্রান্সমিশন বন্ধ হওয়ার সময় লায়কার জীবন সম্ভবত বহু আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। এরপর মহাকাশযানটি দীর্ঘ ১৬২ দিন ধরে কক্ষপথে ছিল এবং ১৯৫৮ সালের ১৪ এপ্রিল বায়ুমণ্ডলে পুনরায় প্রবেশ করে ধ্বংস হয়ে যায় ।

B. সোভিয়েত প্রচার

লায়কার মৃত্যুর আসল কারণ ও সময় দীর্ঘদিন ধরে জনসাধারণের কাছ থেকে গোপন রাখা হয়েছিল । সোভিয়েত সরকার দাবি করেছিল যে লায়কা ছয় দিন পর অক্সিজেনের অভাবে মারা গিয়েছিল, অথবা অক্সিজেন ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই তাকে ব্যথাহীনভাবে 安থানেশিয়া করা হয়েছিল ।
এই মিথ্যা প্রচারটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল। বিজ্ঞানীরা এবং রাজনৈতিক নেতারা জানতেন যে একটি প্রাণীর কক্ষপথে সফলভাবে টিকে থাকা এবং দীর্ঘমেয়াদী ডেটা সংগ্রহ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। তবে বিশ্ব মঞ্চে তাদের প্রযুক্তিগত সাফল্য তুলে ধরার জন্য তারা মৃত্যুর ঘটনাটিকে দীর্ঘায়িত করে দেখিয়েছিল।

Table 2: লায়কার ভাগ্য সম্পর্কে জনসমক্ষে প্রচারিত ভুল তথ্য এবং সত্যের মধ্যে পার্থক্য
বিষয় (Aspect)
প্রাথমিক সোভিয়েত দাবি (Initial Soviet Claim)
২০০২ সালে প্রকাশিত সত্য (Truth Revealed in 2002)
মৃত্যুর সময় (Time of Death)
উৎক্ষেপণের ৬-৭ দিন পর
উৎক্ষেপণের কয়েক ঘন্টা পর, ৪র্থ কক্ষপথে (হাইপারথার্মিয়ার কারণে)
মৃত্যুর কারণ (Cause of Death)
অক্সিজেন স্বল্পতা বা পরিকল্পিত 安থানেশিয়া
প্রযুক্তিগত ব্যর্থতার কারণে সৃষ্ট হাইপারথার্মিয়া
তাপমাত্রা (Cabin Temperature)
নিয়ন্ত্রিত ছিল
৩য় কক্ষপথে 43^{\circ}\text{C} পর্যন্ত বৃদ্ধি
মূল ব্যর্থতা (Core Failure)
অপ্রকাশিত ছিল
R-7 সাসটেইনার বিচ্ছিন্ন না হওয়া

VI. স্পুটনিক ২ থেকে প্রাপ্ত বৈজ্ঞানিক ফলাফল

লায়কার দ্রুত মৃত্যু জৈবিক গবেষণার মূল উদ্দেশ্যকে মারাত্মকভাবে সীমিত করলেও, স্পুটনিক ২ মিশনটি বৈজ্ঞানিক তথ্য এবং প্রকৌশলগত শিক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল।

A. বায়োঅ্যাস্ট্রোনটিক্সে অবদান

লায়কার স্বল্পমেয়াদী উড্ডয়ন দ্বারা একটি জীবিত স্তন্যপায়ী প্রাণীর উপর উৎক্ষেপণ এবং ওজনহীনতার প্রাথমিক প্রভাব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগৃহীত হয়েছিল । প্রথম কয়েকটি কক্ষপথ থেকে সংগৃহীত পালস এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের হার সম্পর্কিত ডেটা মহাকাশ পরিবেশের প্রতি জীবের তীব্র শারীরিক প্রতিক্রিয়ার প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ প্রদান করে ।

মিশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ফলাফল ছিল থার্মাল কন্ট্রোল সিস্টেমের ব্যর্থতা সম্পর্কিত শিক্ষা। এই প্রকৌশল ব্যর্থতা ভবিষ্যতের মহাকাশযানের জীবনধারণ ব্যবস্থা নকশা করার সময় উচ্চ নির্ভরযোগ্যতা এবং বিচ্ছিন্নকরণ পদ্ধতির গুরুত্বকে চিহ্নিত করে । মানুষের জন্য মহাকাশযান তৈরির আগে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের একটি গুরুতর নকশা ত্রুটি চিহ্নিত করা এই মিশনের একটি পরোক্ষ, কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফল ছিল।

B. ভৌত বিজ্ঞান এবং বিকিরণ পরিমাপ

বায়োলজিক্যাল মিশনের বাইরে, স্পুটনিক ২ ভৌত বিজ্ঞানের ডেটা সংগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। মহাকাশযানটিতে মহাজাগতিক রশ্মি (cosmic rays) পরিমাপের জন্য দুটি অভিন্ন, স্বাধীন যন্ত্র স্থাপন করা হয়েছিল । এই যন্ত্রগুলি চার্জযুক্ত কণা গণনা করত এবং মহাজাগতিক বিকিরণের তীব্রতার পরিবর্তন নিরীক্ষণ করত।

এই যন্ত্রগুলির মাধ্যমে গবেষকরা পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র , প্রাথমিক কসমিক রশ্মির উপাদান, এবং বিকিরণের তীব্রতার পরিবর্তন অধ্যয়ন করতে সক্ষম হন । ব্যাটারি শক্তি থাকাকালীন (প্রায় ২০০ ঘণ্টা), যন্ত্রগুলির রেকর্ডকৃত ডেটা উচ্চ নির্ভুলতার সাথে মিলে গিয়েছিল । স্পুটনিক ২-এর মতো দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ বিকিরণের নতুন উপাদান এবং মহাকাশ বিকিরণের সাথে পার্থিব ও মহাজাগতিক প্রক্রিয়াগুলির সম্পর্ক বুঝতে সাহায্য করেছিল ।

যদিও লায়কার দ্রুত মৃত্যু জৈবিক গবেষণার মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করেছিল, নন-বায়োলজিক্যাল ডেটা (বিশেষত বিকিরণ) সংগ্রহ অব্যাহত ছিল। মিশনটি স্বল্পমেয়াদী ওজনহীনতা প্রমাণ করেছিল; তবে, মিশনের বৃহত্তম তাৎপর্য ছিল কক্ষপথের স্থায়িত্ব প্রদর্শন করা। যদিও ডেটা ট্রান্সমিশন মাত্র ছয় দিন পরে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল , মহাকাশযানটি ১৬২ দিন কক্ষপথে ছিল । কক্ষপথে এই দীর্ঘস্থায়িত্ব সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে বিশ্ব মঞ্চে ক্রমাগত প্রদর্শন করতে থাকে, যা তাদের সামরিক ও বৈজ্ঞানিক প্রতিপত্তিকে দৃঢ় করে।

VII. ভূ-রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও মহাকাশ প্রতিযোগিতার তীব্রতা

স্পুটনিক ২-এর উৎক্ষেপণ, স্পুটনিক ১-এর মাত্র এক মাস পরে সংঘটিত হওয়ায়, স্নায়ুযুদ্ধে অভূতপূর্ব কূটনৈতিক ও সামরিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল।

A. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া এবং সংকট

স্পুটনিক ২-এর উৎক্ষেপণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলমান 'স্পুটনিক সংকট'কে আরও গভীর করে তোলে। আমেরিকান মিডিয়া এই ঘটনায় আইজেনহাওয়ার প্রশাসন এবং সামরিক সংস্থার সমালোচনা করে । অনেকেই এটিকে আমেরিকানদের প্রযুক্তিগত পরাজয় হিসেবে দেখতেন।

স্পুটনিক ২-এর উৎক্ষেপণ, বিশেষ করে একটি ভারী পেলোড বহনের ক্ষমতা প্রদর্শন, সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা (ICBM) নিশ্চিত করেছে বলে মনে করা হয়েছিল । এই সামরিক সক্ষমতার ভয় দ্রুত 'মিসাইল গ্যাপ' (ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবধান) এর ভীতিতে পরিণত হয়, যা পরবর্তীতে মার্কিন রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৬০ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জন এফ কেনেডি এই ইস্যু ব্যবহার করে ক্ষমতায় আসেন । এই ঘটনা অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে বাড়িয়ে তোলে, যেখানে উভয় দেশই একে অপরকে আক্রমণের জন্য নতুন এবং উন্নত পদ্ধতি তৈরি করতে ব্যাপক বিনিয়োগ শুরু করে । স্পুটনিক ২ প্রমাণ করে যে মহাকাশ অনুসন্ধান জাতীয় প্রতিপত্তির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত । R-7 ICBM ব্যবহার করে একটি ভারী পেলোড উৎক্ষেপণ করা সামরিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে গণ্য হয়, যা স্নায়ুযুদ্ধের কৌশলগত ভয়কে চরম পর্যায়ে নিয়ে যায় ।

B. বিশ্বজুড়ে সোভিয়েত প্রতিপত্তি

স্পুটনিক ২-এর সাফল্যের ফলে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্বজুড়ে একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে জয়ী হয় এবং তাদের প্রতিপত্তি শীর্ষে পৌঁছায় । ক্রুশ্চেভ এই সাফল্য ব্যবহার করে বিশ্বকে জানান যে সোভিয়েত ইউনিয়ন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে "অসমতার অবস্থান" মেনে নেবে না ।
রাজনৈতিকভাবে, এই সাফল্য সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্য বিশাল সুবিধা নিয়ে আসে। যেসব অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া দেশ পূর্বে মার্কিন প্রযুক্তি ও 'নো-হাউ'কে সম্মান করত, তারা এখন মস্কোর দিকে ফিরে তাকায়। উদাহরণস্বরূপ, জাপানের রাষ্ট্রদূত স্বীকার করেন যে স্পুটনিক মার্কিন বৈজ্ঞানিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রতি জাপানি বিশ্বাসকে নষ্ট করেছে । এই ঘটনা পুঁজিবাদী স্থিতিশীলতার উপরও মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করেছিল, যার ফলে স্টক মার্কেটও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল ।
আমেরিকান মর্যাদা পুনরুদ্ধারের কৌশল হিসেবে, স্পুটনিকের এই বিজয়গুলি, এবং পরবর্তীতে ইউরি গ্যাগারিনের মহাকাশযাত্রা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির অধীনে অ্যাপোলো প্রকল্প (Project Apollo) শুরু করতে উৎসাহিত করেছিল। এই বিশাল কর্মসূচিতে শত শত হাজার কর্মী নিয়োগ করা হয় এবং এর লক্ষ্য ছিল দশকের শেষে চাঁদে মানুষ পাঠিয়ে নিরাপদে ফিরিয়ে আনা ।

VIII. নৈতিকতা, অনুশোচনা এবং লায়কার উত্তরাধিকার

স্পুটনিক ২ মিশনটি বিজ্ঞানের অগ্রগতির জন্য প্রাণীদের ব্যবহারের উপর একটি গভীর এবং স্থায়ী নৈতিক বিতর্ক তৈরি করেছিল।

A. আন্তর্জাতিক প্রতিবাদ এবং নৈতিক বিতর্ক

লায়কার কক্ষপথে যাওয়ার অর্থ ছিল নিশ্চিত মৃত্যু, কারণ মহাকাশযানটিকে পুনরুদ্ধার করার জন্য নকশা করা হয়নি । তার এই নিশ্চিত মৃত্যু বিশ্বজুড়ে প্রাণী অধিকার গোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকে তীব্র আন্তর্জাতিক ক্ষোভের জন্ম দেয় । লায়কার মতো নিরীহ প্রাণীকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে চরম যন্ত্রণার (হাইপারথার্মিয়া) শিকার হতে হয়েছিল , যা মানবিক নৈতিকতার মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল ।
সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ এই প্রতিবাদগুলির জবাবে দুর্বল বিবৃতি প্রদান করে, যেমন "রাশিয়ানরা কুকুর ভালোবাসে" , যা ক্ষোভ প্রশমিত করতে ব্যর্থ হয়। লায়কার গল্প একটি মানবিক ট্র্যাজেডি হিসেবে বিশ্বজুড়ে মানুষের সহানুভূতি অর্জন করে। এটি প্রমাণ করে যে স্নায়ুযুদ্ধের প্রচারণার মাঝেও, মানুষের আবেগ এবং প্রাণী কল্যাণের প্রতি সংবেদনশীলতা একটি শক্তিশালী প্রতি-আখ্যান তৈরি করতে পারে ।

B. বিজ্ঞানীদের অনুশোচনা

এই প্রকল্পের সাথে যুক্ত বিজ্ঞানীদের অনেকেই বছরের পর বছর ধরে লায়কার মৃত্যুর জন্য অনুশোচনায় ভুগেছেন। ওলেগ গাজেঙ্কো (Oleg Gazenko), এই প্রকল্পের অন্যতম শীর্ষ বিজ্ঞানী, ১৯৯৮ সালে জনসমক্ষে গভীর অনুশোচনা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, "সময় যত যাচ্ছে, আমার তত খারাপ লাগছে। আমাদের এটা করা উচিত হয়নি। কুকুরের মৃত্যুকে সমর্থন করার জন্য আমরা মিশন থেকে যথেষ্ট শিক্ষা নিইনি" ।
গাজেঙ্কোর মন্তব্য প্রমাণ করে যে এই মিশনের উচ্চ নৈতিক খরচ ছিল। তিনি স্বীকার করেন যে যদিও মিশনটি প্রয়োজনীয় ছিল কারণ এটি ওজনহীনতার প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে অধ্যয়ন করার সুযোগ দেয় , লায়কার দ্রুত মৃত্যুতে বৈজ্ঞানিক লাভের চেয়ে নৈতিক ক্ষতি বেশি হয়েছে। তার অনুশোচনার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে তিনি পরে ক্রাসাভকা, অন্য একজন মহাকাশ কুকুরকে দত্তক নেন । যখন ২০০২ সালে সত্য প্রকাশিত হয় (যে লায়কা ৪ ঘণ্টার মধ্যে মারা গিয়েছিল), তখন এটি স্পষ্ট হয় যে নৈতিকতার দিক থেকে, দ্রুত ও যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু (হাইপারথার্মিয়া) ব্যথাহীনভাবে ইউথানাইজ করার উদ্দেশ্যকে বাতিল করে দিয়েছিল।

C. লায়কার প্রতীকী উত্তরাধিকার

লায়কার আত্মত্যাগ বায়োঅ্যাস্ট্রোনটিক্সের ইতিহাসে একটি স্থায়ী নৈতিক চিহ্ন রেখে গেছে। তিনি দ্রুত জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে একজন শহীদ এবং প্রাণী অধিকারের প্রতীক হয়ে ওঠেন । মস্কোতে 'Monument to the Conquerors of Space' সহ লায়কার স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা হয়েছে ।
লায়কার গল্প আজও মহাকাশ গবেষণায় প্রাণীর ব্যবহার এবং বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির নৈতিক খরচ নিয়ে বিতর্ককে প্রভাবিত করে।

IX. উপসংহার: তাৎক্ষণিক এবং দীর্ঘমেয়াদী তাৎপর্য

স্পুটনিক ২-এর উৎক্ষেপণ ছিল ১৯৫৭ সালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত ও ভূ-রাজনৈতিক ঘটনাগুলির মধ্যে একটি। এই মিশনটি সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে বিশ্বজুড়ে তুলে ধরে, তবে এর অর্জনগুলি গভীর নৈতিক ও প্রকৌশলগত ব্যর্থতার দ্বারা কলঙ্কিত ছিল।

দ্বৈত প্রযুক্তিগত ফলাফল: 

স্পুটনিক ২ একাধারে সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্য একটি বিশাল প্রযুক্তিগত বিজয় ছিল (ভারী পেলোড কক্ষপথে নিক্ষেপের সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শন) এবং একই সাথে থার্মাল কন্ট্রোল সিস্টেমের ব্যর্থতার কারণে একটি করুণ প্রকৌশল ব্যর্থতা ছিল ।

মানব মহাকাশযাত্রার ভিত্তি: 

যদিও লায়কার জীবন সংক্ষিপ্ত ছিল, মিশনটি উৎক্ষেপণের তীব্র চাপ এবং স্বল্পমেয়াদী ওজনহীনতার প্রতি স্তন্যপায়ী প্রাণীর প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ডেটা সরবরাহ করেছিল । এই তথ্যগুলি সোভিয়েত ও অন্যান্য মহাকাশ কর্মসূচির জন্য জীবনধারণ ব্যবস্থার নকশা এবং পরীক্ষার ক্ষেত্রে অপরিহার্য ভিত্তি স্থাপন করেছিল।

স্নায়ুযুদ্ধের তীব্রতা: 

স্পুটনিক ২ আনুষ্ঠানিকভাবে 'মিসাইল গ্যাপ' ভীতিকে মূল রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত করে । এই উড্ডয়ন স্নায়ুযুদ্ধের প্রতিযোগিতাকে অপ্রত্যাশিত স্তরে উন্নীত করে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক ও মহাকাশ গবেষণায় ব্যাপক আর্থিক বিনিয়োগ করতে বাধ্য করে, যার ফলস্বরূপ অ্যাপোলো প্রকল্পের মতো ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নেওয়া হয় ।

স্থায়ী নৈতিক উত্তরাধিকার: 

লায়কার আত্মত্যাগ বায়োঅ্যাস্ট্রোনটিক্সের ইতিহাসে একটি স্থায়ী নৈতিক চিহ্ন রেখে গেছে। বিজ্ঞানী ওলেগ গাজেঙ্কোর মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের অনুশোচনা স্পষ্ট করে যে মহাকাশ জয়ের জন্য যে নৈতিক মূল্য দিতে হয়েছিল, তার কোনো বাস্তব বৈজ্ঞানিক তথ্যের দ্বারা পূরণ সম্ভব ছিল না। লায়কার গল্প আজও বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির জন্য প্রাণীর ব্যবহারের বিতর্কে একটি সমালোচনামূলক প্রশ্ন হিসেবে পুনরাবৃত্ত হয় ।

তথ্যসূত্র :

1. Space Race and American Foreign Relations - Oxford Research Encyclopedias,

https://oxfordre.com/americanhistory

2. The Soviet Sputniks and American Fears - Marine Corps University,

https://www.usmcu.edu/Outreach/Marine-Corps-University-Press

3. The Sad, Sad Story of Laika, the Space Dog, and Her One-Way Trip Into Orbit,

https://www.smithsonianmag.com

4. Laika - Wikipedia,

https://en.wikipedia.org/wiki/Laika 

5. What was the cause of the cooling system issue in Sputnik 2? - Space Exploration Stack Exchange,

https://space.stackexchange.com

6. Sputnik 2 - Wikipedia,

https://en.wikipedia.org/wiki/Sputnik_2 

7. Sputnik, 1957 - Milestones in the History of U.S. Foreign Relations - Office of the Historian,

https://history.state.gov

8. Sputnik 2 Is Launched | Research Starters - EBSCO,

https://www.ebsco.com/research-starters/history/sputnik-2-launched

9. Sputnik-2 - RussianSpaceWeb.com

https://www.russianspaceweb.com/sputnik2_design.html 

10. Laika And Animal Testing In Space - Consensus Academic Search Engine,

https://consensus.app/questions/laika-and-animal-testing-in-space/ 

11. Who Was Laika the 'Space Dog'? - PETA,

https://www.peta.org/news/laika-space-dog/ 

12. The Tragic Tale of Laika - Soviet Space Dog - Waggel,

https://www.waggel.co.uk

13. Laika Declassified - Smithsonian Magazine,

https://www.smithsonianmag.com

14. SOVIET PAPER ON THE STUDY OF COSMIC RAYS BY ROCKETS AND EARTH SATELLITES - CIA,

https://www.cia.gov

15. STUDY OF COSMIC RAYS BY ROCKETS AND SPUTNIKS IN THE USSR - CIA,

https://www.cia.gov

16. Sputnik Reveals Soviet Progress; Why U.S. Faces Dire Challenge,

http://www.hawaii.edu

17. The Legacy of Laika and Félicette.docx,

https://www.wtmacademy.com

18. Which comes first, science or ethics? - Citizens for Alternatives to Animal Research (CAARE),

https://www.caareusa.org

19. Laika the Space Dog: The Ethics of Animal Experimentation - The Science Survey,

https://thesciencesurvey.com

20. The Celebrity of Laika - Confluence,

https://confluence.gallatin.nyu.edu

21. Laika and Her Comrades: The Soviet Space Dogs Who Took Giant Leaps for Mankind | by Collectors Weekly | Lisa Hix | Medium,

https://medium.com

22. Russia: Trailblazing Canine Cosmonaut Remembered - Radio Free Europe,

https://www.rferl.org
------------xx-----------

মন্তব্যসমূহ

🔰 তারিখ অনুযায়ী তথ্য খুঁজুন : 🔍

আরও দেখান

🔰 মাস অনুযায়ী তথ্য খুঁজুন : 🔍

🔰 বছর অনুযায়ী তথ্য খুঁজুন : 🔍

আরও দেখান

🔰 ব্যক্তি অনুযায়ী তথ্য খুঁজুন : 🔍

আরও দেখান

🔰 বিষয় অনুযায়ী তথ্য খুঁজুন :🔍

আরও দেখান

🔰 তথ্য তালাশ : জনপ্রিয় ব্যক্তি ও বিষয়গুলো দেখুন:

উসেইন বোল্ট, ১০০ মিটার দৌড়ে রেকর্ড

বিশ্ব অ্যালজেইমার্স দিবস

আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের জন্মদিন

শুভাংশু শুক্লার মহাকাশ পাড়ি

ভারতের জাতীয় প্রতীকের নকশাকার

প্রথম ক্রিকেট বিশ্বকাপ

মার্টিন লুথার কিং জুনিয়ার-এর জন্মদিন

বিশ্ব খাদ্য দিবস

উদ্ভাবন-চালিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কী

জ্যোতি বসুর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে প্রথম শপথ গ্রহণ

তথ্য তালাশ : অনলাইন সংকলন

আলী হোসেন, লেখক,
তথ্য তালাশ
সুপ্রিয় পাঠক,

তথ্য তালাশ-এর অনলাইন সংকলনে আপনাকে স্বাগত। 

প্রতিদিন, প্রতি নিয়ত বিশ্বজুড়ে ঘটে চলেছে নানান ঘটনা। কিছু বিখ্যাত, কিছু অখ্যাত, আবার কিছু কুখ্যাতও। এই সব হরেক ঘটনার মধ্যে থাকে এমন কিছু ঘটনা, যা মানুষ মনে রাখতে চায়, চায় স্মরণ করতে।

তথ্য তালাশ সেই লক্ষ্য নিয়েই তৈরি। যেহেতু এটি ডিজিটাল ফরম্যাটে তৈরি, তাই যখনই প্রয়োজন পড়বে, আপনার হাতের মোবাইলে হাত রাখলেই আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপের মত সামনে হাজির হবে তথ্য তালাশ

আপনি কি পড়তে চান এই সংকলনটি! ক্লিক করুন এখানে