আন্তর্জাতিক নৃত্য দিবস
আন্তর্জাতিক নৃত্য দিবস
বিশ্ব নৃত্য দিবস
আজ ২৯ এপ্রিল, আন্তর্জাতিক নৃত্য দিবস। ১৯৮২ সালের ২৯ এপ্রিল প্রথম বিশ্ব নিত্য দিবস, যা আন্তর্জাতিক নৃত্য দিবস নামেও পরিচিত।
প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট এবং মূল ব্যক্তিত্ব :
• প্রতিষ্ঠাতা সংস্থা:
এটি ইউনেস্কোর (UNESCO) প্রধান অংশীদার ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউটের (আইটিআই) নৃত্য কমিটি কর্তৃক তৈরি করা হয়েছে।
• কেন ২৯ এপ্রিল:
জ্যঁ-জর্জেস নভেরে (১৭২৭-১৮১০), যিনি ‘আধুনিক ব্যালের জনক’ হিসেবে পরিচিত। তাঁর জন্মদিনকে (২৯ এপ্রিল) সম্মান জানাতেই দিনটি বেছে নেওয়া হয়। তিনি ১৭৫৪ সালে ব্যালে নৃত্যকে নতুন রূপ দেন এবং ১৭৬০ সালে ‘লেটারস অন দ্য ড্যান্স’ (Letters on the Dance) বইটি রচনা করেন।
• প্রথম উদযাপন:
আইটিআই-এর নৃত্য কমিটি এবং ওয়ার্ল্ড ড্যান্স অ্যালায়েন্স (World Dance Alliance) এর যৌথ উদ্যোগে ১৯৮২ সালে প্রথমবার পালিত হয়।
• ইউনেস্কোর ভূমিকা:
ইউনেস্কো ১৯৮০ সালে জ্যঁ-জর্জেস নভেরের জন্মদিন ২৯ এপ্রিলকে আন্তর্জাতিক নৃত্য দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর থেকে সংস্থাটি বিশ্বব্যাপী এই দিবস উদযাপনে পৃষ্ঠপোষকতা ও স্বীকৃতি দিয়ে আসছে।
দিবসটির উদ্দেশ্য ও বার্ষিক আয়োজন :
মূল উদ্দেশ্য:
রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও জাতিগত বাধা অতিক্রম করে একটি সর্বজনীন ভাষা হিসেবে নৃত্যকে উদযাপন করা এবং এর মাধ্যমে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করা।
ঐতিহ্যবাহী বাণী (Message):
প্রতি বছর আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একজন কোরিওগ্রাফার বা নৃত্যশিল্পী একটি বিশেষ বাণী প্রদান করেন, যা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এই ব্যক্তিত্বকে নির্বাচন করে আইটিআই-এর নির্বাহী পরিষদ।
• বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট:
বাংলাদেশে ১৯৯১ সাল থেকে দিবসটি বিশেষভাবে পালিত হয়ে আসছে। ইন্টারন্যাশনাল ডান্স কাউন্সিল (IDC) বাংলাদেশ শাখা ও বাংলাদেশ নৃত্যশিল্পী সংস্থা যৌথভাবে এ উপলক্ষে অনুষ্ঠান আয়োজন করে।
• ভারতের প্রেক্ষাপট :
ভারতে আন্তর্জাতিক নৃত্য দিবস শুধু একটি বৈশ্বিক দিন নয়, এটি এখানকার সুপ্রাচীন ও বৈচিত্র্যময় নৃত্যঐতিহ্যের এক প্রাণবন্ত উদযাপন। দেশজুড়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও আয়োজনের মাধ্যমে ভারত তার শাস্ত্রীয়, লোকজ ও আধুনিক নৃত্যের বিশাল ভান্ডারকে তুলে ধরে।🇮🇳 ভারতে উদযাপনের ধরণ
ভারতে এই দিনটি বিভিন্ন স্তরে উদযাপিত হয়, যা নৃত্যের প্রতি দেশটির গভীর আবেগকেই প্রকাশ করে।· প্রাতিষ্ঠানিক উদযাপন:
দেশের স্বনামধন্য শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষ আয়োজন করে। যেমন, ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার (IIC), দিল্লিতে নাট্য বৃক্ষ আয়োজিত ১৮তম বিশ্ব নৃত্য দিবস উৎসব অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে SPIC MACAY-এর প্রতিষ্ঠাতা কিরণ শেঠ-কে সম্মানিত করা হয়। আবার, ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট ব্যাঙ্গালোর (IIMB)-এ প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে শুরু হওয়া এক বিকেলে ভরতনাট্যম, কথক, ওড়িশির মতো শাস্ত্রীয় নৃত্যের পাশাপাশি সমকালীন পরিবেশনাও দেখা যায়।
· শাস্ত্রীয় নৃত্যের চর্চা ও প্রদর্শনী:
ভারতীয় নৃত্যের মূলধারার আটটি শাস্ত্রীয় নৃত্যরূপ এই দিনে বিশেষভাবে প্রদর্শিত হয়। এগুলোর কয়েকটি প্রধান রূপ ও তাদের প্রবক্তারা হলেন —
১) ভরতনাট্যম (তামিলনাড়ু): জটিল পায়ের কাজ ও অভিব্যক্তির জন্য বিখ্যাত। এর কিংবদন্তি শিল্পী রুক্মিণী দেবী অরুন্ডেল।
১) ভরতনাট্যম (তামিলনাড়ু): জটিল পায়ের কাজ ও অভিব্যক্তির জন্য বিখ্যাত। এর কিংবদন্তি শিল্পী রুক্মিণী দেবী অরুন্ডেল।
পশ্চিমবঙ্গে এই ধারার এই সময়ের জনপ্রিয় নৃত্যশিল্পী হলেন মধুবনী চট্টোপাধ্যায়। জ্যঁ-জর্জেস নভেরের মতো তিনিও মনে করেন নাচের সঙ্গে রং তুলি সাহিত্য সংগীত এসবের ঘনিষ্ঠ যুগ রয়েছে।
২) কথক (উত্তরভারত): ঘুর্ণন ও গল্প বলার ভঙ্গির জন্য পরিচিত। পণ্ডিত বিরজু মহারাজ এই ধারার পুরোধা ব্যক্তিত্ব।
৩) ওড়িশি (ওড়িশা): ত্রিভঙ্গ ভঙ্গিমা ও মন্দির-নৃত্যের ঐতিহ্য বহন করে। আধুনিক পুনরুজ্জীবনের কারিগর কেলুচরণ মহাপাত্র।
ওড়িশি নৃত্য শিল্পের পশ্চিমবঙ্গীয় ধারার উল্লেখযোগ্য নৃত্যশিল্পী হলেন অভিরূপ সেনগুপ্ত।
৪) মণিপুরী (মণিপুর): রাধা-কৃষ্ণের লীলাকেন্দ্রিক ভক্তিমূলক নৃত্য। এই ধারাকে জনপ্রিয় করতে ঝাভেরী বোনেরা অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। এই নৃত্যশিল্পের শিকড় লুকিয়ে রয়েছে আদিম লোকনৃত্য ‘লাই-হারাওবা’র মধ্যে।
মজার কথা হল, মনিপুরী নৃত্যকে গোটা বিশ্বে জনপ্রিয় করেছিলেন যে প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব তিনি হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বর্তমান সময়ে, এই নৃত্য শিল্পে নজর কেড়েছেন ওয়াংখেইরাকপাম হেনথোই। ইতিমধ্যেই তিনি ভারত সরকারের সাংস্কৃতি মন্ত্রক থেকে ‘সিসিআরটি ট্যালেন্ট স্কলারশিপ’ লাভ করেছেন।
৫) কথাকলি (কেরালা): নাটকীয় রূপসজ্জা ও মুখের অভিব্যক্তির জন্য বিখ্যাত। এর প্রখ্যাত শিল্পী কালামণ্ডলম গোপী।
ভারতীয় ধ্রুপদী নৃত্যের যতগুলি ধারা রয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে বর্ণময় নৃত্যশৈলী হল কথাকলি। কথা শব্দের অর্থ কাহিনী আর কলি শব্দের অর্থ অভিনয়। অর্থাৎ নাচের মুদ্রায় পৌরাণিক গল্প বলা হলো এই শিল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
পশ্চিমবাংলায় কথাকলি শৈলীর জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব হলেন দীপাংশু পাল।
৬) কুচিপুড়ি (অন্ধ্রপ্রদেশ): দ্রুত পায়ের কাজ ও নৃত্য-নাট্যের রূপ। গুরু ভেম্পতি চিন্না সত্যম এই ধারাকে বিশ্বমঞ্চে পরিচিত করান।
৭) মোহিনীয়াট্টম (কেরালা): লাস্যময়ী ও স্নিগ্ধ ভঙ্গির জন্য পরিচিত।
বর্তমান পশ্চিমবাংলায় এই নৃত্য ধারার জনপ্রিয় নৃত্যশিল্পী হলেন গার্গী নিয়োগী। উল্লেখ্য, গার্গী নিয়োগী হলেন কথাকলির বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী দীপাংশু পালের সহধর্মিনী।
৮) সাত্রীয়া (অসম): সত্র বা মঠের ধর্মীয় ঐতিহ্য থেকে উদ্ভূত এই নৃত্যশৈলিও দিবসটিতে বিশেষ স্থান পায়।
· সামাজিক ও শৈল্পিক ভাবনা:
নৃত্য দিবসকে ঘিরে ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গির একটি সুন্দর দিক ২০১৯ সালে মহীশূরে একটি বক্তৃতায় উঠে আসে। অধ্যাপক ড. কে. রামমূর্তি রাও বলেন, ভারতে প্রতিটি দিনই নাচের দিন, এটি আমাদের ঐতিহ্য ও একাত্মতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তিনি আরও জানান, এই ধরনের উদযাপন শিল্পীদের সমস্যার প্রতি প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণেরও একটি সুযোগ।
মূলকথা হলো, আন্তর্জাতিক নৃত্য দিবস নৃত্যের সার্বজনীন আবেদন এবং মানবিক মূল্যবোধকে ধারণ করে। জ্যঁ-জর্জেস নভেরের মতো পুরোধা ব্যক্তিত্বের উত্তরাধিকার বহন করে আজও এটি সারা বিশ্বে নৃত্যকে উদযাপনের প্রধান দিন হিসেবে স্বীকৃত।
💎 ভারতীয় প্রেক্ষাপটের তাৎপর্য
ভারতে আন্তর্জাতিক নৃত্য দিবস উদযাপন নিছক একটি দিনের আনুষ্ঠানিকতা নয়। ভারত এমন এক দেশ, যেখানে এই শিল্পকলা হাজার হাজার বছর ধরে আধ্যাত্মিকতা, কাহিনীবিন্যাস ও দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে একসূত্রে গ্রথিত। বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে নৃত্য দিবসের যে বার্তা, ভারত তা তার নিজস্ব সংস্কৃতির প্রেক্ষিতে এক ভিন্ন মাত্রা দান করে।মূলকথা হলো, আন্তর্জাতিক নৃত্য দিবস নৃত্যের সার্বজনীন আবেদন এবং মানবিক মূল্যবোধকে ধারণ করে। জ্যঁ-জর্জেস নভেরের মতো পুরোধা ব্যক্তিত্বের উত্তরাধিকার বহন করে আজও এটি সারা বিশ্বে নৃত্যকে উদযাপনের প্রধান দিন হিসেবে স্বীকৃত।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন