রাইটার্স বিল্ডিং বা মহাকরণের ইতিহাস
রাইটার্স বিল্ডিং বা মহাকরণের ইতিহাস
কলকাতার ইতিহাসের অন্যতম প্রধান সাক্ষী হলো ‘রাইটার্স বিল্ডিং’ বা ‘মহাকরণ’। লাল ইটের এই বিশাল স্থাপত্যটি কেবল একটি প্রশাসনিক ভবন নয়, বরং এটি ব্রিটিশ আমল থেকে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ পর্যন্ত নানা রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দু।
রাইটার্স বিল্ডিং গড়ে ওঠা ও বিবর্তনের ইতিহাস নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. সূচনালগ্ন (১৭৭৭ - ১৭৮০)
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে কনিষ্ঠ কেরানিদের ‘রাইটার’ (Writer) বলা হতো। এই তরুণ অফিসারদের থাকার জায়গার অভাব মেটাতে ১৭৭৭(মতান্তরে ১৭৭৬) সালে একটি ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়।
স্থপতি: থমাস লায়ন (Thomas Lyon)।
উদ্দেশ্য: মূলত এটি ছিল কোম্পানি রাইটারদের জন্য একটি মেস বা আবাসন। ১৭৮০ সালে এর নির্মাণ কাজ শেষ হয়।
অবস্থান: বিবাদী বাগ (তৎকালীন ডালহৌসি স্কয়ার) এলাকার লাল দিঘির ঠিক পাশেই এটি নির্মিত হয়।
আয়তন : ১৫০ মিটার দীর্ঘ এবং ৫৫ হাজার বর্গফুট এলাকা জুড়ে এই প্রশাসনিক ভবন বিস্তৃত।
২. স্থাপত্যের বিবর্তন ও প্রসারণ
শুরুতে রাইটার্স বিল্ডিং দেখতে আজকের মতো রাজকীয় ছিল না; এটি ছিল সাধারণ তিনতলা একটি লম্বা ভবন। সময়ের সাথে সাথে এর চেহারায় আমূল পরিবর্তন আসে:
১৮২১ সালের সংস্কার: ভবনের সামনে ১২৮ ফুট (৩৯.০১ মিটার) লম্বা একটি বারান্দা এবং আয়োনিক (Ionic) স্থাপত্যরীতির স্তম্ভ যুক্ত করা হয়, যা একে একটি ইউরোপীয় লুক দেয়।
১৮৭৭-১৮৮২ (অ্যাশলে ইডেনের সময়কাল): বাংলার তৎকালীন লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার অ্যাশলে ইডেনের আমলে রাইটার্স বিল্ডিংয়ে বিশাল পরিবর্তন আনা হয়। বর্তমানের লাল ইটের নিও-রেনেসাঁ (Neo-Renaissance) শৈলীটি তখনই তৈরি হয়। লোহা ও পাথরের সূক্ষ্ম কাজ এবং ছাদের ওপর বসানো মূর্তিসমূহ এই সময়েই যুক্ত করা হয়।
৩. ছাদের মূর্তি ও অলঙ্করণ
মহাকরণের ছাদের কার্নিশে অনেকগুলো মূর্তি রয়েছে। এই গ্রিক ও রোমান ঘরানার মূর্তিগুলো বিভিন্ন গুণের প্রতীক:
বাণিজ্য (Commerce), কৃষি (Agriculture), ন্যায়বিচার (Justice) এবং বিজ্ঞান (Science): এই মূর্তিগুলো ব্রিটিশ শাসনের আদর্শকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছিল। মাঝখানে রয়েছে গ্রিক পুরাণের জ্ঞানের দেবী ‘মিনার্ভা’র মূর্তি।
৪. রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব (বিবাদী বাগ) :
রাইটার্স বিল্ডিং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অবিস্মরণীয় মুহূর্তের সাক্ষী।
১৯৩০ সালের ৮ ডিসেম্বর: তিন তরুণ বিপ্লবী— বিনয় বসু, বাদল গুপ্ত এবং দীনেশ গুপ্ত —ইউরোপীয় পোশাকে মহাকরণে প্রবেশ করেন এবং অত্যাচারী জেল ইন্সপেক্টর জেনারেল এন.এস. সিম্পসনকে হত্যা করেন।
এই বীরত্বপূর্ণ ‘অলিন্দ যুদ্ধ’ বা ‘Battle of the Verandah’-এর সম্মানেই ডালহৌসি স্কয়ারের নাম পরিবর্তন করে ‘বিবাদী বাগ’ রাখা হয়।
৫. প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে মহাকরণ
দেশভাগের পর এবং স্বাধীনতার পরবর্তী দীর্ঘ সময় ধরে এটি ছিল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রশাসনিক সদর দপ্তর বা সচিবালয়।
নামকরণ: পশ্চিমবঙ্গ সরকার এর বাংলা নাম দেয় ‘মহাকরণ’।
নবান্নে স্থানান্তর: ২০১৩ সালের ৫ অক্টোবর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে ভবনের জীর্ণ দশা ও অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থার উন্নতির প্রয়োজনে সচিবালয় সাময়িকভাবে হাওড়ার ‘নবান্ন’ ভবনে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
৬. বর্তমান সংস্কার ও স্থিতি :
বর্তমানে মহাকরণে বড় ধরনের সংস্কার কাজ চলছে। লক্ষ্য হলো এর ভেতরে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা অসংখ্য ছোট কক্ষ এবং বাড়তি কাঠামো সরিয়ে ভবনটিকে তার পুরনো ঐতিহাসিক মহিমায় ফিরিয়ে আনা। আইআইটি খড়গপুর এবং স্থাপত্য বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে এই পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া পরিচালিত হচ্ছে।
রাইটার্স বিল্ডিং কেবল ইটের দেয়াল নয়, এটি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দম্ভ, ভারতীয় বিপ্লবীদের সাহস এবং স্বাধীন ভারতের প্রশাসনিক বিবর্তনের এক জীবন্ত সংগ্রহশালা।
৭) মহাকরণ নামকরণ ও সময়কাল :
রাইটার্স বিল্ডিং-এর নাম ‘মহাকরণ’ করার বিষয়টি মূলত ভারতের স্বাধীনতার পর অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের পরবর্তী সময়ের প্রশাসনিক পরিবর্তনের অংশ। এর পেছনে কোনো একক ব্যক্তির নামের চেয়েও প্রশাসনিক ও ভাষাগত ঐতিহ্যের ভূমিকা বেশি ছিল।
রাইটার্স বিল্ডিংকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘মহাকরণ’ বলা শুরু হয় ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, ব্রিটিশ শাসনামলে এটি ‘রাইটার্স বিল্ডিংস’ (Writers' Building) নামেই পরিচিত ছিল। স্বাধীনতার পর যখন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সচিবালয় হিসেবে এটি ব্যবহৃত হতে শুরু করে, তখন এর একটি যুতসই বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে ‘মহাকরণ’ নামটি গৃহীত হয়।
৮) মহাকরণ নামকরণের উদ্দেশ্য :
এই নামকরণের পেছনে মূলত দুটি প্রধান উদ্দেশ্য ছিল:
১) ঔপনিবেশিক প্রভাব থেকে মুক্তি:
‘রাইটার্স বিল্ডিং’ নামটি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ‘রাইটার’ বা তরুণ কেরানিদের বসবাসের আবাসন থেকে এসেছিল। স্বাধীন ভারতের একটি রাজ্যের প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্রের নাম হিসেবে এই ব্রিটিশ পরিচয় মুছে ফেলে একটি দেশীয় ও গাম্ভীর্যপূর্ণ নাম দেওয়ার প্রয়োজন ছিল।
২) পরিচয় ও গাম্ভীর্য:
বাংলা ভাষায় ‘করণ’ (Karan) শব্দের অর্থ হলো অফিস বা যেখানে করণিকরা (Clerks/Scribes) কাজ করেন। প্রাচীন ভারতীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থায় ‘করণ’ শব্দটি সচিবালয় বা দপ্তরের অর্থে ব্যবহৃত হতো। সেই সূত্রেই রাজ্য সরকারের প্রধান বা বৃহত্তম সচিবালয় হিসেবে এর নাম রাখা হয় ‘মহাকরণ’ (মহা + করণ), যার আক্ষরিক অর্থ ‘বৃহৎ বা প্রধান সচিবালয়’।
৯) মহাকরণ নামকরণ কে করেছেন?
নির্দিষ্টভাবে কোনো একজন ব্যক্তির ডিক্রি বা আদেশে এই নাম হয়েছে—এমন নথিবদ্ধ তথ্য কম থাকলেও, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ডঃ প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ বা ডঃ বিধানচন্দ্র রায়ের আমলেই এই বাংলা পরিভাষাটি সরকারিভাবে গ্রহণযোগ্যতা পায়। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রশাসনিক পরিভাষা তৈরির সময় পণ্ডিত ও ভাষা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে এই নামটি নির্বাচন করা হয়েছিল যাতে এটি ব্রিটিশ নামের একটি সার্থক ও ঐতিহ্যানুসারী বিকল্প হয়ে ওঠে।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | তথ্য |
| --- | --- |
| **সময়কাল** | ১৯৪৭ (স্বাধীনতার পর) |
| **মূল উদ্দেশ্য** | প্রশাসনিক ও ভাষাগত স্বকীয়তা প্রদান এবং ব্রিটিশ দাসত্বের প্রতীকী নাম বর্জন। |
| **নামের অর্থ** | ‘করণ’ অর্থ দপ্তর বা করণিকদের স্থান, 'মহাকরণ' অর্থ প্রধান বা বৃহত্তম দপ্তর। |
বর্তমানে ভবনটির সংস্কার কাজ চলায় সচিবালয় সাময়িকভাবে হাওড়ার ‘নবান্ন’-তে স্থানান্তরিত হলেও, ঐতিহাসিকভাবে এই লাল রঙের ভবনটি আজও বাঙালির কাছে ‘মহাকরণ’ নামেই পরিচিত। শোনা যাচ্ছে ২০২৬ সালে নবম নির্বাচিত বিজেপি সরকার এই মহাকরণ থেকেই প্রশাসনিক কাজ চালাবেন।
----------xx-----------

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন